ঢাকা, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬

১৬ আশ্বিন ১৪৩৩, ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৮

বিশ্ববাজার মাতাচ্ছে সাতক্ষীরার সফটশেল কাঁকড়া

ব্যাংকার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১১:৫৯, ৯ মে ২০২৬ | আপডেট: ১১:৫৯, ৯ মে ২০২৬

বিশ্ববাজার মাতাচ্ছে সাতক্ষীরার সফটশেল কাঁকড়া

সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলায় চাষ হওয়া নরম খোসার (সফটশেল) কাঁকড়া আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল চাহিদা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলে কাঁকড়া উৎপাদনের জন্য প্রতি বছর গড়ে উঠছে নতুন নতুন খামার, যা জেলা তথা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বর্তমানে সফটশেল (নরম খোসার) কাঁকড়া সাতক্ষীরা জেলার মানুষের ভাগ্য বদলাতে শুরু করেছে। সম্প্রতি সাতক্ষীরা জেলা সরেজমিনে পরিদর্শন করে ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সূত্রে এই সব তথ্য পাওয়া গেছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য মতে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে জুন মাসে কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছে ১৩ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। 

গত ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের একই সময়ে (জুলাই-জুন) এ রপ্তানি ছিলো ৯ দশমিক ২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, এতে বিগত বছরে চেয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৮ দশমিক ৭০ শতাংশ। কেবল চলতি বছরের জুন মাসে রপ্তানি হয়েছে ১ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমান বাণিজ্যিকভাবে চাষ যোগ্য কাঁকড়ার মধ্যে শিলা কাঁকড়া অন্যতম। শিলা কাঁকড়া খোলস বদলের সময় প্রায় তিন ঘণ্টা খোলস বিহীন থাকে। তখন কাঁকড়ার ওপর শুধু একটি নরম আবরণ থাকে। ঠিক সেই সময় কাকড়াঁগুলো বিক্রির জন্য উপযুক্ত হয়। 

আন্তর্জাতিক বাজারে সফটশেল (নরম খোসা) কাঁকড়ার উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়, যার কারণে অনেক চাষি চিংড়ি ছেড়ে এখন কাঁকড়া চাষে ঝুঁকছেন। লাভ বেশি হওয়ায় চাষীরা এখন চিংড়ি চাষ ছেড়ে কাকড়াঁতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন বেশি। 

বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর ছাড়াও সদর উপজেলা ও কালিগঞ্জ উপজেলাসহ অন্যান্য স্থানেও সফটশেল কাঁকড়া চাষ হচ্ছে।

কাঁকড়া চাষে পুকুরের পানির উপরিস্তর ব্যবহৃত হয়। যাতে অব্যবহৃত থাকে পানির নিচের স্তর। পুকুরের পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য কাঁকড়ার পাশাপাশি সাদা মাছ যেমন রুই, কাতলা ও তেলাপিয়াসহ নানা মাছ চাষ করে লাভবান হচ্ছেন অনেক চাষী। 

সফটশেল কাঁকড়া সাধারণত খাঁচা পদ্ধতিতে চাষ হয়। যাতে পানির ওপরে খাঁচাগুলোতে কাঁকড়া চাষ করলে নিচের স্তরের পানিতে সাদা মাছের চাষ করা যায়। 

সফটশেল কাঁকড়া দ্রুত প্রক্রিয়াজাত ও রান্না করা যায় বলে আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা বেশি। বর্তমানে সফটশেল কাঁকড়া চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন এশীয় দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

কাঁকড়া শুধু সাতক্ষীরা জেলার মানুষের আয়েরই উৎস নয়, বরং কাঁকড়া চাষের মাধ্যমে এই অঞ্চলে মানুষের বেকারত্বও দূর করছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এই কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। 

সরেজমিনে শ্যামনগর উপজেলার কয়েকটি কাঁকড়ার খামারে গিয়ে দেখা যায়, কাঁকড়ার খামারে কর্মব্যস্ত দিন কাটাচ্ছেন নারী ও পুরুষরা। কেউ ছোট ছোট করে কাটছেন কাঁকড়ার খাবার তেলাপিয়া মাছ এবং কেউ কেউ নিয়ম করে দেখছেন কাঁকড়ার খোলস পাল্টাচ্ছে কি-না।

খুলনা মৎস্য পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সফটশেল কাঁকড়া রপ্তানিতে গত দুই অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে (জুলাই থেকে এপ্রিল) বাংলাদেশ থেকে ১২০৭.৭৬ মেট্রিক টন সফটশেল কাঁকড়া রপ্তানি হয়, যার বাজার মূল্য ১৬.৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এরআগে অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১,১৬৬.৮৮ মেট্রিক টনে। যার বাজার মূল্য ছিল ১৪.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

শ্যামনগরের চাষি মোহাম্মদ শামীম বলেন, ‘আমাদের এই অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায়ই নানা ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। অনেক সময় ভাইরাসের আক্রমণেও কাঁকড়া পোনা মারা যায়, যা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। তারপরও অন্যান্য কাঁকড়া চাষের তুলনায় সফটশেল কাঁকড়া চাষ লাভজনক হওয়ায় আমরা এটি চাষ করছি। পাশাপাশি পুকুরে সাদা মাছও চাষ করছি, যাতে আর্থিকভাবে কিছুটা বাড়তি লাভ পাওয়া যায়।’

আরেক চাষি আবদুল্লাহ আল কাইয়ুম বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এখন মোটামুটি সবাই সফটশেল কাঁকড়া চাষের সঙ্গে যুক্ত। এই কাঁকড়া বিশেষ বক্সের মধ্যে চাষ করতে হয়। প্রতিটি বক্স তৈরিতে খরচ হয় প্রায় ১১০ টাকা। আমার খামারে প্রায় ১২ হাজার বক্স রয়েছে। বর্তমানে বাজারে সফটশেল কাঁকড়ার চাহিদা অনেক বেশি, তবে সেই তুলনায় যোগান কম।’

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বলেন, ‘সফটশেল কাঁকড়ার উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। চাষিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা আধুনিক ও টেকসই পদ্ধতিতে কাঁকড়া চাষ করতে পারেন।’

সূত্র: বাসস

এএ

ব্যাংকার প্রতিবেদন

আরও পড়ুন