নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১০:৪৭, ১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১০:৪৭, ১ অক্টোবর ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
আমদানি পর্যায়ে প্রতি কেজি মাল্টার দাম প্রায় ৮৭ টাকা। কিন্তু চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে সেই মাল্টাই বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ আমদানি মূল্যের তুলনায় ভোক্তাকে দিতে হচ্ছে পাঁচ গুণেরও বেশি দাম।
দক্ষিণ আফ্রিকা ও মিসর থেকে আমদানি করা মাল্টার দাম দেশে এতটা বেড়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে উচ্চ শুল্ক-কর, পরিবহন ও আনুষঙ্গিক ব্যয়। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং ডেঙ্গুর প্রকোপে চাহিদা বাড়ায় পাইকারি ও খুচরা বাজারেও দাম বেড়েছে।
বাংলাদেশ কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, কমলা ও মাল্টাজাতীয় তাজা ফল আমদানিতে মোট করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও অগ্রিম আয়কর।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের আমদানি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি কেজি মাল্টার গড় আমদানি মূল্য প্রায় ৮৭ টাকা। এর ওপর শুল্ক-কর দিতে হয় প্রায় ১০৭ টাকা। অর্থাৎ বন্দর থেকে খালাসের সময়ই প্রতি কেজি মাল্টার ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১৯৩–১৯৪ টাকা।
এরপর হিমায়িত কনটেইনারে আসা মাল্টা বন্দর থেকে গুদামে নেওয়া, কনটেইনার ও পরিবহনসহ বিভিন্ন খরচ যোগ হয়। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এতে আরও ১০–১৫ টাকা বাড়ে। ফলে সরাসরি হিসাবেই খরচ দাঁড়ায় ২০৪–২০৯ টাকা কেজি।
তবে পচনশীল ফল হওয়ায় নষ্ট হওয়া, বন্দর ও কনটেইনারসংক্রান্ত অতিরিক্ত খরচসহ আমদানিকারকদের প্রকৃত ব্যয় কেজিতে ২৩০–২৪০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
উচ্চ শুল্ক-কর আরোপের পর দেশে মাল্টার আমদানিও ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১–২২ অর্থবছরে দেশে ২ লাখ ৯৪ হাজার টন মাল্টা আমদানি হয়েছিল। পরের অর্থবছরে শুল্ক-কর বাড়ানোর পর আমদানি কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ২০ হাজার টনে।
২০২৩–২৪ অর্থবছরে আমদানি আরও কমে ১ লাখ ৭৩ হাজার টনে নামে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার টন এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ১ লাখ ৫৩ হাজার টন।
অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে মাল্টা আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। চলতি অর্থবছরেও নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। অর্থবছরের প্রথম প্রায় তিন মাসে আমদানি হয়েছে মাত্র ২১ হাজার টন।
বন্দর থেকে খালাসের পর মাল্টা যায় চট্টগ্রাম ও ঢাকার পাইকারি বাজারে। সেখান থেকে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে তা পৌঁছে খুচরা বিক্রেতার কাছে। সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে প্রতিটি ধাপেই দাম পরিবর্তিত হয়।
চট্টগ্রামের ফলমন্ডির ব্যবসায়ীরা জানান, প্রায় তিন সপ্তাহ আগে পাইকারি বাজারে মাল্টা ২২০–২৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। এরপর দ্রুত দাম বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে ১৫ কেজির একটি কার্টন ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। অর্থাৎ পাইকারিতেই প্রতি কেজির দাম ৪০০–৫০০ টাকায় উঠে যায়।
গত বুধবার চট্টগ্রামের বিভিন্ন খুচরা বাজারে মাল্টা বিক্রি হয়েছে ৪৮০–৫২০ টাকা কেজি দরে।
রেলওয়ে মেন্স সুপার মার্কেটের ফল ব্যবসায়ী মো. বাবুল বলেন, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত অনেক আমদানিকারক লোকসান করেছেন। এতে পরবর্তী সময়ে আমদানি কমে যায়। সেপ্টেম্বরে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম দ্রুত বেড়েছে। তবে নতুন চালান আসায় দাম আবার কমতে শুরু করেছে। সরবরাহ বাড়লে আগামী সপ্তাহে দাম আরও কমতে পারে।
মাল্টা আমদানিকারক এইচআর করপোরেশনের কর্ণধার মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন বলেন, শুল্ক-কর, বন্দর মাশুল ও কনটেইনার পরিবহনসহ সব ধরনের খরচ বেড়েছে। তবে আমদানিকারক বা পাইকারি পর্যায়ের দামের তুলনায় খুচরা বাজারে অনেক ক্ষেত্রে কেজিতে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।
বিদেশি ফল আমদানিতে সব সময় বর্তমানের মতো উচ্চ করভার ছিল না। ২০২১–২২ অর্থবছরে মাল্টাসহ বিভিন্ন ফলের মোট করভার ছিল প্রায় ৮৯ শতাংশ।
ডলার-সংকটের মধ্যে আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ২০২২ সালের মে মাসে ফলসহ বিভিন্ন পণ্যে ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে করভার আরও বাড়ে।
২০২৪–২৫ অর্থবছরের একপর্যায়ে ফলের করভার ১৩৬ দশমিক ২০ শতাংশে উঠেছিল। পরে তা কিছুটা কমানো হয়। বর্তমানে কমলা, মাল্টা, আপেল ও আঙুরের মতো বেশ কিছু ফলে মোট করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মাল্টার দাম না বাড়লেও শুধু কর কাঠামোর কারণে দেশে প্রবেশের আগেই এর দাম দ্বিগুণের বেশি হয়ে যায়।
এবার মাল্টার দাম বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হিসেবে ডেঙ্গুর প্রকোপকেও দেখছেন ব্যবসায়ীরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গুতে ৭৯ হাজার ৬২০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন ২৪৫ জন।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, জ্বর ও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য মাল্টা ও কমলার মতো ফল কেনার প্রবণতা বাড়ায় বাজারে চাহিদা বেড়েছে। সরবরাহ কম থাকার সময়ে বাড়তি চাহিদা দাম আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, মাল্টার অস্বাভাবিক দাম বাড়ার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। এরই মধ্যে বাজারে অভিযান চালানো হয়েছে।
তিনি জানান, বুধবার ফলমন্ডিতে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ বিষয়ে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সব মিলিয়ে ৮৭ টাকার আমদানি মূল্যের একটি মাল্টা শুল্ক-কর, পরিবহন, সরবরাহ সংকট এবং বাজারের বিভিন্ন স্তরের মূল্য সংযোজন পেরিয়ে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে গিয়ে ৫২০ টাকায় উঠছে। ফলে আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি কর কাঠামো ও বাজার ব্যবস্থাপনা—দুটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
নিজস্ব প্রতিবেদক