ঢাকা, রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৫ আশ্বিন ১৪৩৩, ০৭ রবিউস সানি ১৪৪৮

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কে বাংলাদেশের রপ্তানিতে কতটা প্রভাব?

ব্যাংকার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৯:৫৭, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২০:০১, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কে বাংলাদেশের রপ্তানিতে কতটা প্রভাব?

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপে বাংলাদেশি পণ্যের গড় মোট শুল্কভার প্রায় ২৫ শতাংশে দাঁড়াবে। তবে প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপরও কাছাকাছি হারে শুল্ক থাকায় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে বড় পরিবর্তন হবে না বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ ও সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে কার্যকর না করার অভিযোগে এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নতুন শুল্কের হার ১০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের গড় নিয়মিত শুল্ক প্রায় ১৫ শতাংশ হওয়ায় নতুন শুল্ক যোগ হলে মোট শুল্কভার দাঁড়াবে প্রায় ২৫ শতাংশ।

সাধারণত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকেই শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। তবে শুল্ক বাড়লে আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যায়, ফলে সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের আগ্রহ কমতে পারে।

প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপরও কাছাকাছি শুল্ক

রপ্তানিকারকদের মতে, আগের ১০ শতাংশ শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর একই হারে নতুন শুল্ক আরোপ হওয়ায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শুল্কের পরিমাণে কার্যত কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন নিয়ে চলমান আরেকটি তদন্ত নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সেখানে নতুন কোনো শুল্ক আরোপ হলে তা বাংলাদেশের রপ্তানিতে চাপ তৈরি করতে পারে।

গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশিত এক নোটিশে নতুন শুল্কের বিষয়টি জানানো হয়। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পথে থাকা পণ্য ২৮ জুলাই দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিট পর্যন্ত নতুন শুল্ক থেকে অব্যাহতি পাবে।

১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১-এর আওতায় এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। যেসব ৬০টি দেশের ওপর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেসব দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ আসে। তবে তেল, গ্যাস, সার ও কিছু খাদ্যপণ্যসহ নির্দিষ্ট কয়েকটি পণ্যকে নতুন শুল্কের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক

ইউএসটিআরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ ১৭টি দেশের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তালিকায় আরও রয়েছে ভারত, আর্জেন্টিনা, যুক্তরাজ্য, কম্বোডিয়া, কানাডা, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগো।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইজারল্যান্ডের পণ্যে মোট শুল্কহার ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখা হয়েছে। ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, চীন ও মিসরসহ ৩৮টি দেশের পণ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক।

‘প্রতিযোগিতায় বড় পরিবর্তন হবে না’

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপর কাছাকাছি হারে শুল্ক আরোপ হওয়ায় প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তন হবে না। তবে শুল্কের কারণে পণ্যের দাম বাড়লে চাহিদা কমতে পারে, যার প্রভাব সব দেশের ওপরই পড়বে।

তিনি বলেন, নতুন শুল্ক আরোপের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

পাল্টা শুল্ক থেকে নতুন শুল্ক

২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শুরুতে এই হার ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে কয়েক দফা পরিবর্তনের পর গত বছরের ২ আগস্ট তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। ৭ আগস্ট থেকে নতুন হার কার্যকর হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের গড় নিয়মিত শুল্ক প্রায় ১৫ শতাংশ। এর ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল।

এরপর চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি বাণিজ্যচুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের ওপর পাল্টা শুল্কের হার ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আরোপ করা পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করে।

এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ট্রেড অ্যাক্টের আওতায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের পণ্যে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে এই শুল্ক কার্যকর হয়। আইন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্য এই শুল্ক আরোপ করতে পারেন।

জোরপূর্বক শ্রম নিয়ে তদন্ত

জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য ঠেকাতে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশ যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে গত ১২ মার্চ তদন্ত শুরু করে ইউএসটিআর।

এর আগে বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের আরও ১৫টি দেশের উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক ও সিমেন্ট খাতে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে কি না, সেটি তদন্তের আওতায় রয়েছে। এ বিষয়ে শুনানিও শেষ হয়েছে।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে কার্যকর না করার অভিযোগে বাংলাদেশের ওপর শুল্ক আরোপ অন্যায় ও অযৌক্তিক।

তবে প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপর কাছাকাছি হারে শুল্ক থাকায় বাংলাদেশের রপ্তানিতে নতুন করে বড় প্রভাব পড়বে না বলেও মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, গত বছর পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চাহিদা কিছুটা কমেছিল। অতিরিক্ত শুল্ক উঠে গেলে চাহিদা বাড়বে বলে যে প্রত্যাশা ছিল, নতুন শুল্কের কারণে তা নাও হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বড় রপ্তানি বাজার

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশ প্রায় ৯০৪ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশই তৈরি পোশাক। এ বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগীদের মধ্যে রয়েছে ভিয়েতনাম, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, কম্বোডিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান ও হন্ডুরাস।

প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনাম ও চীনের পণ্যে সর্বোচ্চ সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ফলে শুল্কের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ ওই দুই দেশের তুলনায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার জন্য তিন বছরের ট্যারিফ-রেট কোটা (টিআরকিউ) চালুর বিষয়টি বিবেচনা করছে ইউএসটিআর। এটি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা ও বস্ত্র উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হবে না।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, মার্কিন ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো পাল্টা শুল্ক স্থগিত হওয়ার পরও সমপরিমাণ শুল্ক হিসাব করেই পোশাকের দাম নিয়ে দর-কষাকষি করছে। কারণ, তাদের ধারণা ছিল অন্য কোনো উপায়ে একই ধরনের শুল্ক আরোপ হতে পারে।

তাঁর মতে, শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের শুল্কহার বেশি না হলে আপাতত বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ নেই।

ব্যাংকার প্রতিবেদন

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন