ব্যাংকার ডেস্কঃ
প্রকাশ: ২০:২৩, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২০:২৪, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় রাখা সোনার একটি অংশ সরিয়ে লন্ডনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নেদারল্যান্ডস। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডি নেদারল্যান্ডশে ব্যাংক (ডিএনবি) জানিয়েছে, নিউইয়র্ক ও কানাডার অটোয়ায় থাকা ৮৬ টন সোনা লন্ডনে স্থানান্তর করা হবে।
ডিএনবির মতে, উত্তর আমেরিকা, যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডসে সোনার মজুত ছড়িয়ে রাখলে ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে কোনো সংকট তৈরি হলে সোনা দ্রুত ব্যবহার করাও সহজ হবে।
লন্ডনে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে রাখা সোনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রচলিত মানদণ্ড পূরণ করে। ফলে সংকটের সময়ে এটি দ্রুত লেনদেনযোগ্য ও ব্যবহারযোগ্য বলে মনে করছে ডিএনবি।
নেদারল্যান্ডসের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশটির মোট সোনার মজুতে ভৌগোলিক ভারসাম্যও বদলাবে। বর্তমানে মোট মজুতের ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ নিউইয়র্কে এবং ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ অটোয়ায় রয়েছে। স্থানান্তরের পর দুই শহরেই থাকবে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ করে। অন্যদিকে লন্ডনে থাকা সোনার অংশ ১৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে হবে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ। বাকি ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ থাকবে নেদারল্যান্ডসে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে সোনা সরিয়ে নেওয়া ইউরোপীয় দেশগুলোর তালিকায় নেদারল্যান্ডসের আগে যুক্ত হয়েছে ফ্রান্স। গত জানুয়ারিতে ব্যাংক দ্য ফ্রান্স নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা ১২৯ টন সোনা বিক্রি করে দেয়। গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জানুয়ারির মধ্যে এই সোনা বিক্রি করা হয়, যা ফ্রান্সের মোট সোনার মজুতের প্রায় ৫ শতাংশ।
বিক্রি করা সোনার অর্থ দিয়ে ইউরোপে সমপরিমাণ নতুন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণকারী সোনা কেনে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন সোনাগুলো এখন প্যারিসে দেশটির অন্যান্য মজুতের সঙ্গে রাখা হয়েছে। ফ্রান্সের মোট সোনার মজুত প্রায় ২ হাজার ৪৩৭ টন।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোর সোনা সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০১৭ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুন্দেসব্যাংক নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ থেকে ৩০০ টন সোনা দেশে ফিরিয়ে নেয়।
জার্মানির পরিকল্পনা ছিল দেশের অধিকাংশ সোনা ফ্রাঙ্কফুর্টের ভল্টে রাখা। তবে এরপরও দেশটির মোট সোনার ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ নিউইয়র্কে রয়ে যায়। অন্যদিকে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থাকা জার্মানির ৩৭৪ টন সোনা পুরোপুরি দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্যিক উত্তেজনা ও যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিদেশে থাকা সোনা দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জোরালো হয়েছে। তবে জার্মানি ও ইতালি এ ধরনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি। নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভের ভল্টে এই দুই দেশের বিপুল পরিমাণ সোনা রয়েছে।
জার্মানি ও ইতালি বিশ্বের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃহত্তম সোনার মজুতধারী দেশ। তাদের মজুত যথাক্রমে ৩ হাজার ৩৫২ টন ও ২ হাজার ৪৫২ টন। ইতালির মোট সোনার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিউইয়র্কে রাখা আছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সোনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের—প্রায় ৮ হাজার ১৩৩ টন।
জার্মানির মোট সোনার ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা আছে। লেবাননের মোট সোনার প্রায় ৪০ শতাংশও নিউইয়র্কে রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের সোনা বিশ্বের বিভিন্ন ভল্টে রাখা আছে, যার মধ্যে নিউইয়র্কও রয়েছে। ইতালির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংকা দ’ইতালিয়ার মোট সোনার ৪৩ শতাংশের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে রাখা আছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে।
তবে এই তালিকা পূর্ণাঙ্গ নয়। কারণ অনেক দেশই তাদের সোনার মজুত ঠিক কোথায় রাখা হয়েছে, সে তথ্য প্রকাশ করে না।
বিদেশে রাখা সোনা দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ রয়েছে ভেনেজুয়েলারও। সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের শাসনামলে দেশটি বিদেশি ব্যাংকে রাখা প্রায় ১৬০ টন সোনা দেশে ফিরিয়ে নেয়। ২০১১ সালে শুরু হওয়া এ প্রক্রিয়া শেষ হয় ২০১২ সালের জানুয়ারিতে।
অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে জাতীয় সম্পদ সুরক্ষা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার পদক্ষেপ হিসেবে ওই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন চাভেজ।
তবে ভেনেজুয়েলার প্রায় ৩১ টন সোনা এখনো লন্ডনের ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে রয়েছে। দেশটি এই সোনা ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করলেও ব্যাংক অব ইংল্যান্ড তা আটকে দেয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর সরকারকে বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়াই এর অন্যতম কারণ ছিল।
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে থাকা দেশটির আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারে নতুন সরকার আবারও উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
ব্যাংকার ডেস্কঃ