ব্যাংকার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২০:১৬, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২০:১৮, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
উজবেকিস্তানের জিজ্জাখ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে এখন চোখে পড়ে হাজার হাজার সৌর প্যানেল। একসময় যেখানে শুধু অনুর্বর ভূমি ছিল, সেখানেই সূর্যের আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তর করে তৈরি হচ্ছে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি। চীনা একটি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ ও পরিচালনায় গড়ে ওঠা এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রথম ধাপ গত মার্চে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেছে।
পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হলে বছরে প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এতে প্রায় ৪ লাখ মানুষের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জিজ্জাখের এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র শুধু একটি জ্বালানি প্রকল্প নয়, এটি সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিওভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে চীন-কেন্দ্রিক বাস্তব সহযোগিতারও একটি উদাহরণ। গত ২৫ বছরে আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেন্দ্রিক একটি সংগঠন থেকে এসসিও এখন অর্থনীতি, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন সহযোগিতার একটি বিস্তৃত প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
মঙ্গলবার এসসিও সদস্য দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের কাউন্সিলের ২৬তম বৈঠকে যোগ দেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পূর্তির সঙ্গে এবারের সম্মেলনও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
সম্মেলনে এসসিওর ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য চারটি প্রস্তাব তুলে ধরেন শি জিনপিং। এর মধ্যে অন্যতম ছিল উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অভিন্ন সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা জোরদার করা।
তিনি এসসিওর ‘সাংহাই স্পিরিট’-এর গুরুত্বও তুলে ধরেন। পারস্পরিক আস্থা, পারস্পরিক সুবিধা, সমতা, পরামর্শ, সভ্যতার বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান এবং অভিন্ন উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষাই এই নীতির মূল ভিত্তি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শি বলেন, গত ২৫ বছরে এই নীতির আলোকে এসসিওভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বেড়েছে, বিনিয়োগ সম্পর্ক গভীর হয়েছে এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী হয়েছে। এর ফলে মধ্য এশিয়াসহ বিস্তৃত অঞ্চলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এসসিওভুক্ত দেশগুলোর অবকাঠামো সহযোগিতার একটি বড় উদাহরণ চীন-কিরগিজস্তান-উজবেকিস্তান রেলপথ।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এই রেলপথ নির্মাণের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে চীনের সঙ্গে মধ্য এশিয়া এবং বৃহত্তর ইউরেশীয় অঞ্চলের যোগাযোগ আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমিয়ে আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অবকাঠামো প্রকল্প শুধু পরিবহনব্যবস্থা উন্নত করে না; বরং নতুন শিল্প, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পথও খুলে দেয়।
এসসিওভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে বিভিন্ন সহযোগিতা প্ল্যাটফর্মও কাজ করছে।
গত মাসে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে স্থানীয় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা নিয়ে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে শতাধিক কোম্পানি অংশ নেয়। সম্মেলনে ১৯৩টি সহযোগিতা ও বাণিজ্য চুক্তি সই হয়, যার মোট আর্থিক মূল্য প্রায় ১ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ইউয়ান বা ২৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
অন্যদিকে, এক বছর আগে তিয়ানজিনে চালু হওয়া চীন-এসসিও ডিজিটাল ইকোনমি কো-অপারেশন প্ল্যাটফর্ম ইতোমধ্যে ২৯টি আন্তসীমান্ত সহযোগিতা প্রকল্পে সহায়তা করেছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে কম্পিউটিং অবকাঠামো, ডিজিটাল বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক মহাকাশ খাত।
ফলে এসসিওর অর্থনৈতিক সহযোগিতা এখন বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ থেকে বহুপক্ষীয় সমন্বয়ের দিকে এগোচ্ছে।
মঙ্গলবারের সম্মেলনে শি জিনপিং বলেন, উচ্চমানের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ সহযোগিতা এবং ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এসসিওকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে চীন।
তিনি জানান, চীন ভবিষ্যতেও এসসিও ডিজিটাল ইকোনমি ফোরাম ও এসসিও কৃষি প্রদর্শনীর মতো আয়োজন চালিয়ে যাবে। পাশাপাশি সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক এআই অ্যাপ্লিকেশন সহযোগিতা কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আগামী তিন বছরে এসসিওভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে ১০০টি প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যও ঘোষণা করেছেন তিনি। পাশাপাশি চীন-এসসিও সহযোগিতার মাধ্যমে সবুজ শিল্পে দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এসসিওর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে শুরু থেকেই সংগঠনটির বাস্তব সহযোগিতা কার্যক্রমে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
এসসিও প্রতিষ্ঠার পরপরই সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজ করার প্রস্তাব দেয় চীন। ২০০৩ সালে এসসিও একটি বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা কর্মসূচি গ্রহণ করে।
এর আওতায় স্বল্পমেয়াদে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজ করা, মধ্যমেয়াদে স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ নিয়মকাঠামো গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদে পণ্য, মূলধন, সেবা ও প্রযুক্তির আরও অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রকল্পগুলোতেও চীন আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত এসসিওভুক্ত অন্যান্য দেশগুলোতে চীনের মোট বিনিয়োগ ৮৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান ও পাকিস্তানে বিনিয়োগ ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে চীন সবচেয়ে বড় উৎস বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত বছর তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত এসসিও সম্মেলনে চীন জ্বালানি, সবুজ শিল্প ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয়। পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন, উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার জন্য সহযোগিতা কেন্দ্র গড়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়।
এরপর ছয়টি উদ্যোগই চালু হয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মের আওতায় পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং যৌথভাবে দক্ষ জনবল তৈরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১৬০টির বেশি সহযোগিতা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
রাশিয়ার হায়ার স্কুল অব ইকোনমিকসের গবেষক এগর প্রোখিন মনে করেন, এসসিওর বিকাশে চীন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে।
তার মতে, ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ ইউরেশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পরিবহন ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ উন্নত করতে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ এসসিও সদস্য দেশগুলোর উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে ব্যবসার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের মানুষের জন্যও বাস্তব সুফল বয়ে আনছে।
গত ২৫ বছরে এসসিওর বিবর্তন শুধু সদস্য সংখ্যা বাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সংগঠনটি এখন নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, কৃষি, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মতো খাতেও সক্রিয় হচ্ছে।
উজবেকিস্তানের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, চীন-কিরগিজস্তান-উজবেকিস্তান রেলপথ এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিভিন্ন প্রকল্প দেখাচ্ছে—এসসিওর সহযোগিতা এখন কাগজে-কলমে নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এসব উদ্যোগ মধ্য এশিয়ার অর্থনীতি ও আঞ্চলিক যোগাযোগের বাস্তব পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে।
আগামী দিনে সবুজ জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল বাণিজ্য ও আন্তদেশীয় অবকাঠামোয় সহযোগিতা আরও বাড়লে এসসিও ইউরেশিয়ার অর্থনৈতিক একীকরণে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ব্যাংকার প্রতিবেদন