ব্যাংকার ডেস্কঃ
প্রকাশ: ২০:০৩, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২০:০৪, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার এখন বিশ্বের সর্বোচ্চ। ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, এ সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সর্বশেষ পাওয়া তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, খেলাপি ঋণের হারে বাংলাদেশের পরেই রয়েছে মধ্য আফ্রিকার দেশ চাদ। দেশটির খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ। এরপর রয়েছে ইকুয়েটোরিয়াল গিনি ৩০ শতাংশ, আলজেরিয়া ২০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ঘানা ১৮ দশমিক ১১ শতাংশ।
চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে তা বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।
এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় উঠেছিল।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে খেলাপি ঋণ বাড়ার বড় কারণ হলো আগে আড়ালে থাকা সমস্যাগ্রস্ত ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়া। দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পুনঃতফসিল, বিশেষ সুবিধা এবং বিভিন্ন হিসাবগত ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক ঋণকে নিয়মিত দেখানো হয়েছিল। পরে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা ও নিরীক্ষায় এসব ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসে।
ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণ শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি, ব্যবসায়িক মন্দা ও জ্বালানি সংকটও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
বিশেষ করে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি এখন খেলাপি। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি আরও কয়েকটি ব্যাংকের অর্ধেকের বেশি ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে।
খেলাপি ঋণের হারে একসময় বিশ্বের শীর্ষে ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন। ২০২৩ সালে দেশটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ। রাশিয়ার হামলার পর অর্থনৈতিক সংকটে এই হার প্রায় ৩৯ শতাংশে পৌঁছেছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে পুরোনো খেলাপি ঋণ অবলোপন, ঋণ আদায় ও পুনর্গঠন এবং তুলনামূলক ভালো মানের নতুন ঋণ বিতরণ বাড়ানোর মাধ্যমে ইউক্রেনের খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
২০২৫ সালের শেষ দিকে দেশটির কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বিপুল পরিমাণ পুরোনো খেলাপি ঋণ হিসাব থেকে অবলোপন করে। এর ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে ইউক্রেনের খেলাপি ঋণের হার ২৩ দশমিক ৯১ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশে নেমে আসে।
২০২৬ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত দেশটির খেলাপি ঋণের হার আরও কমে ১২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
তবে ঋণ অবলোপনের অর্থ ঋণ মওকুফ নয়। এসব ঋণের বিপরীতে আগে থেকেই শতভাগ সঞ্চিতি রাখা হয়েছিল। অবলোপনের পর ঋণগুলো মূল ব্যালান্স শিটের বাইরে নেওয়া হলেও গ্রাহকের কাছ থেকে পাওনা আদায়ের অধিকার ব্যাংকের থাকে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বর্তমান চিত্রকে শুধু সাম্প্রতিক সময়ের নতুন ঋণখেলাপি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সুবিধা ও পুনঃতফসিলের মাধ্যমে যেসব সমস্যাগ্রস্ত ঋণ আড়ালে ছিল, সেগুলোর একটি বড় অংশ এখন আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসেবে উঠে আসছে।
২০২৪ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। দুই বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ঋণ শ্রেণীকরণ ও সঞ্চিতি সংরক্ষণের নিয়ম আরও কঠোর করেছে। পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার করা হয়েছে। এর ফলে আগে নিয়মিত দেখানো অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণও খেলাপি হিসেবে শনাক্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পুনঃতফসিল বা ঋণ অবলোপনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের হার কমানো হলে ব্যাংক খাতের মূল সমস্যার সমাধান হবে না। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, সম্পদ জব্দ ও অর্থ আদায়, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি এবং ব্যাংকের ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করা জরুরি।
একই সঙ্গে নতুন করে যাতে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ তৈরি না হয়, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তা না হলে কাগজে খেলাপি ঋণের হার কমলেও ব্যাংক খাতের প্রকৃত আর্থিক ঝুঁকি থেকে যাবে।
ব্যাংকার ডেস্কঃ