ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৬ আশ্বিন ১৪৩৩, ০৮ রবিউস সানি ১৪৪৮

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল, শেষ পর্যন্ত বোঝা কার কাঁধে?

ব্যাংকার ডেস্কঃ

প্রকাশ: ১১:২৮, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১১:৩১, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল, শেষ পর্যন্ত বোঝা কার কাঁধে?

জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু পেট্রলপাম্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে অর্থনীতির প্রায় সব খাতে। কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা চাপে রয়েছে। একই সঙ্গে দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও উচ্চ ঋণব্যয়ের মধ্যে নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়ায় অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, জ্বালানির বাড়তি এই ব্যয়ের পরোক্ষ প্রভাব পরিবহন, খাদ্য, কৃষি, শিল্প ও সেবা খাত হয়ে সামগ্রিক মূল্যস্তরে কতটা ছড়িয়ে পড়বে। এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর ও সুস্পষ্ট কৌশল।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ডিজেলের গুরুত্ব অনেক। পরিবহন, কৃষি, শিল্প এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে প্রথমেই বাড়ে পণ্য পরিবহনের খরচ। বাস ও ট্রাক পরিচালনার ব্যয়, কৃষিতে সেচের খরচ এবং জেনারেটর ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি পরিচালনার ব্যয়ও বেড়ে যায়।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সাধারণত এই বাড়তি ব্যয়ের পুরোটা নিজেরা বহন করে না। সময়ের সঙ্গে এর একটি বড় অংশ পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দামেও প্রভাব ফেলতে পারে।

খাদ্যপণ্যে বাড়তে পারে চাপ

খাদ্য মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত করা পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপেই পরিবহন, সেচ ও সরবরাহ ব্যয় জড়িত। জ্বালানির দাম বাড়লে এসব ব্যয়ের একাধিক জায়গায় একসঙ্গে চাপ তৈরি হয়।

এর সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও দাম বাড়ার আশঙ্কা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি আগেভাগে বিবেচনায় নিয়ে পণ্যের দাম ও মজুরি সমন্বয় শুরু করতে পারেন। এতে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং পরে তা নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বেশি চাপ

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সামাজিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। তুলনামূলকভাবে উচ্চ আয়ের পরিবার সরাসরি বেশি জ্বালানি ব্যবহার করলেও নিম্ন আয়ের পরিবার অনেক ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ, তাদের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয় খাদ্য, যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে।

বাসভাড়া কিছুটা বাড়া, চাল-সবজির দাম বৃদ্ধি কিংবা রান্নার খরচ বেড়ে যাওয়া—এসবই নিম্ন আয়ের পরিবারের মাসিক বাজেটে বড় চাপ তৈরি করতে পারে।

শহরের নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ, ডিজেলনির্ভর সেচের ওপর নির্ভরশীল কৃষক এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। তাদের আয় সাধারণত মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমান হারে বাড়ে না। ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

শুধু ভর্তুকি বা দাম বাড়ানো—দুই বিকল্পেই সমাধান নয়

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলে সরকার অনির্দিষ্টকাল ভর্তুকি দিয়ে যেতে পারে না। বড় অঙ্কের ভর্তুকি সরকারের আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ তৈরি করে। এতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের দায় বাড়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয়ের সুযোগও কমতে পারে।

তবে সমস্যাটিকে শুধু ‘ভর্তুকি দেওয়া’ অথবা ‘দাম বাড়ানো’—এই দুই বিকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখাও ঠিক হবে না। জ্বালানি খাতের অভ্যন্তরীণ অদক্ষতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, ক্রয় ও বিতরণব্যবস্থার অদক্ষতা, সীমিত স্বচ্ছতা এবং জ্বালানির ওপর বিভিন্ন ধরনের কর ও শুল্কের চাপ—এসব বিষয়ও পর্যালোচনা করা জরুরি। খাতটির ব্যয় ও অদক্ষতা কমানোর উদ্যোগ না নিয়ে নিয়মিতভাবে খুচরা মূল্য বাড়ানো হলে শেষ পর্যন্ত সেই অদক্ষতার বোঝাও ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে।

কর কাঠামোও পর্যালোচনার দাবি রাখে

জ্বালানি তেলের ওপর কর ও শুল্কের বিষয়টিও নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার সময় দেশে উচ্চ করভার বহাল থাকলে ভোক্তার ওপর দ্বিগুণ চাপ তৈরি হয়।

সরকারের রাজস্বের প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে। তবে কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলার সময় জ্বালানির ওপর বর্তমান কর কাঠামো কতটা যৌক্তিক, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। বিশেষ করে ডিজেলের মতো পণ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর দামের সঙ্গে প্রায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার ব্যয় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত।

বিনিয়োগ ও ব্যবসায়ও বাড়বে চাপ

বর্তমান পরিস্থিতিও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির জন্য খুব একটা সুবিধাজনক নয়। একদিকে ঋণের ব্যয় বেশি এবং ব্যবসায় অর্থায়ন কঠিন, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ চাহিদাও দুর্বল। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মুনাফার ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে।

বড় প্রতিষ্ঠান কিছুটা সামলে নিতে পারলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার সেই সক্ষমতা তুলনামূলক কম। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ স্থগিত করতে, উৎপাদন কমাতে কিংবা নতুন কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে পারে।

রপ্তানিমুখী শিল্পও এর বাইরে নয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে দেশের অভ্যন্তরে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

প্রয়োজন লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা

জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের নীতিকে শুধু দাম বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনা প্রয়োজন।

প্রথমত, জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য পদ্ধতি থাকা দরকার। আন্তর্জাতিক বাজারের সাময়িক মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরের স্থায়ী ব্যয়চাপ—দুটিকে আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জ্বালানির ওপর কর ও শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিচালনব্যবস্থা, ক্রয়পদ্ধতি ও বিতরণব্যবস্থায় কোথায় অদক্ষতা রয়েছে, তা খোলামেলাভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।

একই সঙ্গে সবার জন্য নির্বিচারে জ্বালানি সস্তা রাখার পরিবর্তে নিম্ন আয়ের পরিবার, কৃষি এবং প্রয়োজনীয় গণপরিবহন খাতকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। এতে সরকারের আর্থিক চাপ কমানোর পাশাপাশি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকেও সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।

শেষ পর্যন্ত জ্বালানির মূল্য সমন্বয় শুধু হিসাবের বিষয় নয়; এটি বণ্টনেরও প্রশ্ন। সরকারের আর্থিক চাপ কমানো প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেই চাপের মূল্য কে দিচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, কর কাঠামোর পুনর্মূল্যায়ন এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার ব্যবস্থা ছাড়া শুধু জ্বালানির দাম বাড়ানোর পথে হাঁটলে সরকারের আর্থিক হিসাব হয়তো কিছুটা সহজ হবে। কিন্তু এর বিনিময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, বৈষম্য বৃদ্ধি এবং দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো বড় মূল্য দিতে হতে পারে।

ব্যাংকার ডেস্কঃ

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন