ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

২৯ আশ্বিন ১৪৩৩, ০২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ২.৫ শতাংশ করল বিশ্বব্যাংক

ব্যাংকার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১১:৪৯, ১৩ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১১:৪৯, ১৩ জুন ২০২৬

বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ২.৫ শতাংশ করল বিশ্বব্যাংক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে ২০২৬ সালের জন্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে বিশ্বব্যাংক।

সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধ যদি আরো ছড়িয়ে পড়ে এবং তার প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আরো কমে মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। আর এমনটি হলে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে। খবর রয়টার্স।

ওয়াশিংটনভিত্তিক বৈশ্বিক এ ঋণদাতা সংস্থা গত বৃহস্পতিবার অর্ধবার্ষিক ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস’ বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা প্রতিবেদনে এ আশঙ্কাজনক তথ্য প্রকাশ করেছে। চলতি বছরের জন্য করা এবারের পূর্বাভাসটি গত জানুয়ারির অনুমানের চেয়ে দশমিক ১ শতাংশ কম। ২০১৯ সালের শেষের দিকে শুরু হওয়া কভিড-১৯ মহামারীর পর এটিই বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ২ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল, যা আগের পূর্বাভাসের চেয়ে কিছুটা ভালো ছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাত চলতি বছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে বিশ্বব্যাংক বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দেশেরই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধটি চতুর্থ মাসে গড়িয়েছে। এ সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেশ বেড়েছে, যার প্রধান কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া। এ নৌপথটি বন্ধ হওয়ার কারণে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রধান পথগুলো অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদাহার বৃদ্ধির মতো কঠোর আর্থিক নীতির কথা ভাবছে।

বিশ্বব্যাংক জানায়, যুদ্ধের কারণে শুধু জ্বালানি তেল নয়, বিশ্ববাজারে সারের দামও হু হু করে বাড়ছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, সারের এ আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে অচিরেই বিশ্বজুড়ে খাদ্য সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাধারণ ও দরিদ্র মানুষ।

বিশ্বব্যাংক তার মূল অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে ধরে নিয়েছে যে চলতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৪ ডলারের কাছাকাছি থাকবে, যা ২০১৫ সালের গড় দামের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেশি। এ মূল পূর্বাভাসে আশা করা হয়েছে, জুলাইয়ের শেষের দিকে জ্বালানি সরবরাহের এ সংকট কিছুটা কেটে যাবে এবং বিশ্বজুড়ে মূল মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে।

প্রতিবেদনে একটি বিকল্প ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেছে সংস্থাটি। যদি জ্বালানি সরবরাহের এ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারে পৌঁছায়, তবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়াবে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে। আর পরিস্থিতি যদি আরো খারাপ হয়, যেখানে জ্বালানি সংকট আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে, তখন মানুষের আস্থা দ্রুত কমে যাবে। ফলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে কমে মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসবে।

বিশ্বব্যাংকের উপ-প্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে বলেন, ‘এ ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিগুলো এটাই দেখায় যে জ্বালানি সরবরাহ সংকট এবং আর্থিক বাজারের চাপ যখন একে অন্যকে প্রভাবিত করে, তখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কত দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে।’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আগের দশকের তুলনায় চলতি দশকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সামগ্রিকভাবে কম থাকবে। যদিও ২০২৭ ও ২০২৮ সালের দিকে প্রবৃদ্ধি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে ২ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে, তাও এটি ২০১০-এর দশকের গড় প্রবৃদ্ধির চেয়ে অনেক কম।

বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল বলেন, ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দা, সরকারি বিনিয়োগ হ্রাস, ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের শ্লথগতির মতো বেশকিছু দীর্ঘমেয়াদি কারণে এ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’

গিল উল্লেখ করেন, ২০০৮ বা ২০১৮ সালের আর্থিক সংকটের সময়ের চেয়ে বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি অনেক কম শক্তিশালী। তিনি পূর্বাভাস দেন, আগামী বছরগুলো উচ্চ নীতিগত অনিশ্চয়তা, শক্তিশালী মূল্যস্ফীতি এবং উচ্চ সুদাহারের মধ্য দিয়েই কাটবে।

এ দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে। চীন ও ভারতের মতো বড় দেশগুলোর অর্থনীতিকে বাদ দিলে, বিশ্বের ডজনখানেক উন্নয়নশীল দেশ এখন দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক স্থবিরতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে আয়ের ব্যবধান কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে তারা কোনো অগ্রগতি করতে পারছে না।

বিশ্বব্যাংকের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি চলতি বছর মহামারী-পরবর্তী সময়ের সর্বনিম্ন পর্যায়ে অর্থাৎ ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা গত বছর ছিল ৪ দশমিক ৪ শতাংশ।

বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২ দশমিক ২ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে বিশ্বব্যাংক, যদিও ২০২৮ সালের মধ্যে তা আরো কমে ২ শতাংশ হতে পারে। ইউরোপীয় অঞ্চলের (ইউরোজোন) প্রবৃদ্ধি চলতি বছর মাত্র দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে, যা গত বছর ছিল ১ দশমিক ৪ শতাংশ। জাপানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কমে দশমিক ৭ শতাংশে নামবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর চীনের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে, যা গত বছর ছিল ৫ শতাংশ।

এ সংকটে মধ্যপ্রাচ্য ও তার চারপাশের অঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২ দশমিক ৭ শতাংশ কমিয়ে ২০২৬ সালের জন্য মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ নির্ধারণ করেছে।

তবে বিশ্বব্যাপী এ মন্দার মধ্যেও ভারত বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বড় অর্থনীতি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতের অর্থনীতি ৬ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়বে, যা গত বছর ছিল ৭ শতাংশ।

কর্মকর্তারা আশা করছেন, আগামী দুই দশক ধরে ভারত তার এ শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে পারবে।

এএ

ব্যাংকার প্রতিবেদন

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন