ব্যাংকার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২০:৫৩, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ২০:৫৩, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামানের নামে থাকা বিপুলসংখ্যক ব্যাংক হিসাব ও অস্বাভাবিক অঙ্কের লেনদেনকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ১১টি ব্যাংকে মনিরুজ্জামানের নামে মোট ১৫৯টি অ্যাকাউন্টে ৩৯ কোটি ১০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে, যার মধ্যে বর্তমানে স্থিতি রয়েছে এক কোটি ৮০ লাখ টাকা।
বিএফআইইউর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২১ সালে ইসলামী ব্যাংকে একটি সঞ্চয়ী হিসাব খোলেন মনিরুজ্জামান। ওই হিসাবে দুই কোটি টাকা জমা হয় তাঁর বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় আট মাস পর। পে-অর্ডারের মাধ্যমে অর্থটি আসে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে, যা আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার দৃষ্টিতে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অবসরের পর মনিরুজ্জামান ২৭ মাস ধরে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ারে চাকরি করেন। বিএফআইইউ মনে করছে, একজন সাবেক ডেপুটি গভর্নরের নামে এত বিপুলসংখ্যক এফডিআর হিসাব এবং কোটি কোটি টাকার লেনদেন স্বাভাবিক নয়।
এসব তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠিয়ে অধিকতর তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংস্থাটি অনিয়ম শনাক্ত করতে পারলেও সরাসরি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার তাদের নেই। তাই বিষয়টি দুদকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সরকার মনিরুজ্জামানকে ২০১৬ সালের নভেম্বরে প্রথম দফায় তিন বছরের জন্য এবং দ্বিতীয় দফায় ৬২ বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়। তাঁর চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর।
বিএফআইইউ জানায়, ২০২১ সালের ১৭ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের গুলশান সার্কেল-১ শাখায় মনিরুজ্জামান একটি সঞ্চয়ী হিসাব খোলেন। এর দুই দিন পর ১৯ আগস্ট ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের জুবিলি রোড শাখা থেকে এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের নামে পরিচালিত হিসাব থেকে তাঁর নামে দুই কোটি টাকার একটি পে-অর্ডার ইস্যু করা হয়। ২৩ আগস্ট পে-অর্ডারটি গুলশান শাখা থেকে ছাড় করা হয় এবং পরদিন তিনি একই শাখায় ৭০ লাখ টাকার দুটি ও ৬০ লাখ টাকার একটি এফডিআর করেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের হিসাব থেকে মনিরুজ্জামানের ব্যক্তিগত হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের সুনির্দিষ্ট কারণ বা ব্যবসায়িক ভিত্তির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ কারণেই লেনদেনটি সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তদন্তে আরও দেখা যায়, ওই হিসাব খোলার তিন মাস পর থেকে এসএস পাওয়ারের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে নিয়মিত অর্থ জমা হতে থাকে। ২৭ মাসে মোট এক কোটি ৬৩ লাখ টাকা জমা হয়। এর মধ্যে এক কোটি ৩৮ লাখ টাকা বেতন হিসেবে এবং ২৫ লাখ টাকা গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছে।
বিএফআইইউর বিশ্লেষণে বলা হয়, এসব তথ্য থেকে ধারণা করা যায় যে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অবসরের পর মনিরুজ্জামান এসএস পাওয়ারে যোগ দেন। প্রতিষ্ঠানটির ৭০ শতাংশ মালিকানা এস আলম গ্রুপের হাতে এবং বাকি ৩০ শতাংশ মালিকানা দুটি চীনা কোম্পানির।
এছাড়া প্রাইম ব্যাংকের গুলশান শাখায় ২০২৩ সালের মার্চে মনিরুজ্জামানের নামে একটি সঞ্চয়ী হিসাব খোলা হয়। হিসাব খোলার দিনই সাত লাখ টাকা জমা দিয়ে একই দিনে একটি এফডিআর করা হয়। পরবর্তী সময়ে ওই হিসাবে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের লেনদেন হয়েছে, যা বিএফআইইউর কাছে সন্দেহজনক বলে বিবেচিত হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৬ সালে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর দুদক তদন্ত শুরু করলেও তিনি পরে ছাড়পত্র পান। এরপর ২০১৬ সালের ৪ ডিসেম্বর ডেপুটি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ এস আলম গ্রুপের হাতে চলে যায়। ওই সময় ইসলামী ব্যাংকে সরেজমিন পরিদর্শন বন্ধ রাখতে বিশেষ নির্দেশনা দেন মনিরুজ্জামান, যিনি তখন পরিদর্শন বিভাগগুলোর দায়িত্বে ছিলেন।
অভিযোগ প্রসঙ্গে এস এম মনিরুজ্জামান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, এস আলম গ্রুপের কাছে একটি বাড়ি বিক্রির বিপরীতে তিনি দুই কোটি টাকা পেয়েছিলেন, যা এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের হিসাব থেকে তাঁর অ্যাকাউন্টে এসেছে।
বাড়ি বিক্রির সূত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে বাড়িটি বিক্রির বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন এবং সেখান থেকেই বিষয়টি এস আলম জানতে পারেন।
২০২১ সালের আগস্টে দুই কোটি টাকা পাওয়ার পর ওই বছরের নভেম্বরে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কমার্শিয়াল অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করেছি। কোনো অনৈতিক সুবিধা নেইনি।’
তাঁর নামে ১৫৯টি অ্যাকাউন্টে ৩৯ কোটি টাকার বেশি লেনদেনের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি দাবি করেন, এতগুলো অ্যাকাউন্ট নেই; তবে বিভিন্ন সময়ে এফডিআর খুলেছেন এবং সবই আয়কর নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এএ
ব্যাংকার প্রতিবেদন