ব্যাংকার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৯:১২, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৯:১৩, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অগ্রগতিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছে গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ট্রেডিং আয় অর্জন করেছে ইউরোপের শীর্ষ বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো।
তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভিজিবল আলফার সংগৃহীত উপাত্ত অনুযায়ী, গত বছর ইউরোপের পাঁচ প্রভাবশালী ব্যাংক ডয়চে ব্যাংক, বিএনপি পারিবাস, সোসিয়েতে জেনারেল, বার্কলেস ও ইউবিএস সম্মিলিতভাবে ৪ হাজার ৩৯০ কোটি ইউরো আয় করেছে। মূলত শেয়ারবাজার এবং বন্ড, মুদ্রা ও পণ্য (এফআইসিসি) ট্রেডিং থেকে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ এসেছে।
ইউরোপীয় ব্যাংক খাতে ট্রেডিংয়ের শীর্ষস্থানটি টানা সপ্তম বছরের মতো ধরে রেখেছে বার্কলেস। ব্যাংকটির গ্লোবাল মার্কেটস বিভাগ গত বছর সব মিলিয়ে ১ হাজার ১০ কোটি ইউরো আয় করেছে।
এদিকে ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো ফরাসি ব্যাংক বিএনপি পারিবাসকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে জার্মানির ডয়চে ব্যাংক। যদিও ডয়চে ব্যাংকের এখন আর কোনো শেয়ার লেনদেন বা ইকুইটি ট্রেডিং ব্যবসা নেই, তবুও সংস্থাটির বন্ড, মুদ্রা ও পণ্য (এফআইসিসি) থেকেই এসেছে ৯৬০ কোটি ইউরো আয়।
ইউরোপের বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোর এ অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে বড় ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কাও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ইউরোপের বিনিয়োগ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, ‘বর্তমান বাজার পরিস্থিতি অনেকটা “অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ফেঁপে” উঠেছে।’ এআই ও ডেটা সেন্টার খাতে অতিমাত্রায় বিনিয়োগকে তিনি এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ওই ব্যাংকারের মতে, ভবিষ্যৎ পরিণতির কথা চিন্তা না করেই মুনাফার পেছনে ‘ছুটন্ত ট্রেনে চড়ে বসার’ এ প্রবণতা ২০০৮ সালের ভয়াবহ বৈশ্বিক আর্থিক মন্দার আগের বছরগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিকে তিনি একটি অনিশ্চিত ও থমথমে সময় হিসেবে অভিহিত করেছেন।
মূলত বছরজুড়ে শেয়ার, বন্ড ও মুদ্রাবাজারের তীব্র ওঠানামাকে কাজে লাগিয়েই ট্রেডাররা মোটা অংকের মুনাফা লুফে নিয়েছেন। ফলে পুরো খাতের ব্যাংকগুলো এমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখাতে সক্ষম হয়েছে।
গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে ফেরার পর তার অর্থনৈতিক নীতি ও এজেন্ডা ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারে অস্থিরতার প্রাথমিক সূত্রপাত ঘটায়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা এবং পরবর্তী সময়ে কিছু হুমকি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত বাজারকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।
পাশাপাশি বছরজুড়ে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। এআই খাতে ‘হাইপারস্কেলার’ বা বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশাল অংকের বিনিয়োগ এবং এর বিপরীতে কবে নাগাদ মুনাফা আসবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ এ অস্থিরতাকে আরো উসকে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৬ সালে বাজারের অস্থিরতা কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয় ব্যাংকগুলোর ট্রেডিং আয় বাড়ার গতিও ধীর হয়ে আসবে। মর্নিংস্টারের স্কোল্টজ বলেন, ‘গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধে বাজারের অস্থিরতা অনেকটা প্রশমিত হয়েছে এবং আয় একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘২০২৬ সালে আমরা আয়ের ক্ষেত্রে আরো কিছুটা মন্থর গতি প্রত্যাশা করছি, তবে বৈশ্বিক বাজার থেকে আসা রাজস্ব দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় এখনো বেশ ওপরে থাকবে।’
ইউরোপীয় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, গত বছরের এ অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে তাদের ট্রেডিং সক্ষমতা বাড়ার জন্য করা পূর্ববর্তী বিনিয়োগগুলো বড় ভূমিকা রেখেছে।
বার্কলেসের ট্রেডাররা ২০২৪ সালের তুলনায় শেয়ারবাজার (ইকুইটি) ও এফআইসিসি ট্রেডিং থেকে ১৫ শতাংশ বেশি আয় করেছেন। তাদের এ অসাধারণ প্রচেষ্টার পুরস্কার হিসেবে বড় অংকের বোনাস দেয়া হয়েছে।
তবে ব্রিটিশ এ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ট্রেডার ও বিনিয়োগসংক্রান্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য আলাদাভাবে বোনাসের হিসাব প্রকাশ করেনি।
তবে কোম্পানির নথিপত্র অনুযায়ী, বার্কলেস ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের ৮১২ জন ‘মেটেরিয়াল রিস্ক টেকার’ (যাদের সিদ্ধান্ত ব্যাংকের আর্থিক ঝুঁকির ওপর বড় প্রভাব ফেলে) গত বছর সম্মিলিতভাবে ৭৩ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ডের একটি বোনাস তহবিল দেয়া হয়। এটি ২০২৪ সালের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি।
এ হিসাব অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যেকে গড়ে ৯ লাখ পাউন্ড করে বোনাস পেয়েছেন। বোনাসের সঙ্গে নির্দিষ্ট বেতন যোগ করলে তাদের বার্ষিক মোট উপার্জনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে গড়ে ১৫ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড। তালিকায় থাকা অন্য চারটি ব্যাংক এখনো ২০২৫ সালের জন্য বোনাস তহবিলের তথ্য প্রকাশ করেনি।
সূূত্র: বণিক বার্তা
এএ
ব্যাংকার প্রতিবেদন