ঢাকা, রোববার, ০১ মার্চ ২০২৬

১৬ ফাল্গুন ১৪৩২, ১১ রমজান ১৪৪৭

বন্ধ হয়ে গেল সেই ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’

ব্যাংকার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১০:৪২, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১০:৪৩, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বন্ধ হয়ে গেল সেই ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের গোড়াপত্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী মূল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে। একসময়ে ভারতের বুকে ব্যবসা করতে এসে ২০০ বছরেরও বেশি রাজত্ব করে গেছে, সেই ব্রিটিশ কোম্পানির ব্যবসা চিরতরে বন্ধ হলো। বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী করপোরেট সাম্রাজ্য গড়ে তোলা এই কোম্পানি প্রায় ১৭০ বছর আগেও একবার বন্ধ হয়েছিল। 

‘সানডে টাইমস’–এর রিপোর্ট বলছে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই কোম্পানি ২০১০ সাল থেকে লাক্সারি খাবার–দাবার এবং পানীয়ের খুচরা ব্যবসা শুরু করেছিল। সেই কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ও বিতর্কিত ইতিহাস সৃষ্টিকারী এক ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তি ঘটল।

এটাই অবশ্য প্রথম নয়, ১৮৫৭ সালে, ভারতে মহাবিদ্রোহের পরেও একবার ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি পুনরুজ্জীবিত হয় ২০১০ সালে একজন ভারতীয়র হাত ধরেই। সঞ্জীব মেহতা নামে ওই ভারতীয় উদ্যোক্তার উদ্দেশ্য ছিল, হোলসেল ভেঞ্চার হিসেবে কোম্পানি ফের শুরু করা।

২০১০–এ মেফেয়ারে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’র নামে ২,০০০ স্কোয়্যার ফুটের একটি দোকান খোলেন সঞ্জীব। সেখানে বিভিন্ন অভিজাত ব্র্যান্ডের খাবার ও পানীয় বিক্রি হতো।  

তবে প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ পরিস্থিতি হলো— প্যারেন্ট কোম্পানি ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গ্রুপ’–এর কাছে এদের বকেয়া ৬,০০,০০০ পাউন্ড (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৭.৫ কোটি টাকা)। এদের করের বোঝা ১,৯৩,৭৮৯ পাউন্ড এবং কর্মীদের প্রাপ্য বকেয়া ১,৬৩,১০৫ পাউন্ড। ইস্ট ইন্ডিয়ার নাম–বহনকারী অন্যান্য শাখা কোম্পানিও ঝাঁপ ফেলেছে। 

লন্ডনের মেফেয়ারের ৯৭ নিউ বন্ড স্ট্রিটে অবস্থিত তাদের ফ্ল্যাগশিপ স্টোরটি খালি পড়ে আছে এবং ভাড়ার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

এ সংক্রান্ত আরেকটি প্রতিষ্ঠান, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কালেকশনস লিমিটেডের বিরুদ্ধেও ঋণদাতারা উইন্ডিং-আপ পিটিশন করেছে। মেহতার সঙ্গে যুক্ত এবং ‘ইস্ট ইন্ডিয়া’ নাম ব্যবহারকারী আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও বিলুপ্ত হয়েছে।

১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর রানি প্রথম এলিজাবেথের দেওয়া রাজকীয় সনদের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল একটি যৌথ মূলধনি কোম্পানি, যেখানে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনে লাভ–লোকসান দুটোরই ভাগীদার হতেন।

১৬১২–১৬১৩ সালের দিকে সুরাটে কোম্পানিটি প্রথম বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে। ১৮ শতকে এসে এটি একটি সাধারণ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান থেকে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে রূপ নেয়। তারা দুর্গ নির্মাণ করে, স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে জোট গড়ে এবং ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী ও ভারতীয় রাজ্যগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

কোম্পানির নীতির ফলে ব্যাপক শোষণ, নগদ ফসল চাষে বাধ্য করা এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। এসব কর্মকাণ্ড বারবার দুর্ভিক্ষ ডেকে আনে, যার মধ্যে গ্রেট বেঙ্গল ফ্যামাইন অন্যতম; এতে আনুমানিক তিন কোটি মানুষের মৃত্যু হয়।

১৮৫৭ সালে ভারতের প্রথম স্বাধীনতাযুদ্ধের পর ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ সরকার সরাসরি ভারতের শাসনভার গ্রহণ করে, যার মাধ্যমে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। পরবর্তী সময়ে ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে এবং সব ক্ষমতা ব্রিটিশ রাজপরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। এর মধ্য দিয়েই ভারতে ব্রিটিশরাজের সূচনা হয়।

এএ

ব্যাংকার প্রতিবেদন

আরও পড়ুন