ব্যাংকার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২২:৪৪, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ২২:৪৪, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
অনিয়ম-দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত শরিয়াহ্ভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে একটিতে রূপান্তরের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, সেটির চূড়ান্ত রূপ দিতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। ঘোষণা দিয়েও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি নামের এ ব্যাংকের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা যায়নি।
এ ব্যাংকগুলোর কর্মীদের বড় অংশ একীভূতকরণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আমানত ফেরত না পাওয়ার শঙ্কা থেকে একীভূতকরণের বিরোধিতা করছেন আমানতকারীরাও। আবার ব্যাংকগুলোর পুরনো বিনিয়োগকারীরাও একীভূতকরণের বিরুদ্ধে আদালতে যাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে যোগান দেয়া অর্থে গঠিত দেশের বৃহৎ মূলধনের এ ব্যাংক টিকিয়ে রাখা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসির মূলধন হিসেবে এরই মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার যোগান দিয়েছে সরকার। এ অর্থ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারের সুকুকে বিনিয়োগ করা হয়েছে। বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা থেকে গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দেয়ার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় বহন করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তারা বলছেন, প্রতি মাসে পাঁচ ব্যাংকের কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ পরিচালন খাতে ব্যয় হয় অন্তত ৩৫০ কোটি টাকা। কিন্তু এ পরিমাণ অর্থ ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ও অন্যান্য খাত থেকে আয় হচ্ছে না। এতে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর আগেই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ওপর বিপুল লোকসানের ভার এসে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে সরকারের যোগান দেয়া মূলধন দ্রুতই ফুরিয়ে যাবে।
একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংক হলো- এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। এর মধ্যে এক্সিম ছাড়া বাকি ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের হাতে। এ ব্যাংকগুলোতে ১৮ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। এসব কর্মীর বড় একটি অংশও চট্টগ্রামের। এ কর্মীরা ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণের বিরোধিতা করে আসছেন।
পাঁচ ব্যাংক একীভূতরণের বিরোধিতা করছেন আমানতকারীরাও। এ ব্যাংকগুলোতে প্রায় ৭৫ লাখ গ্রাহকের ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার আমানত জমা রয়েছে, যার বড় অংশ ক্ষুদ্র আমানতকারীদের। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে এ ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা চাহিদা অনুযায়ী টাকা তুলতে পারছে না। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে আমানতের মুনাফার ওপর ‘হেয়ারকাট’ নীতি আরোপ করা হয়েছে।
ঘোষিত নীতি অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য আমানতকারীরা মাত্র ৪ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের আরোপিত এ নীতির তীব্র বিরোধিতা করছেন আমানতকারীরা।
কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আমানতকারীদের বিরোধিতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন পাঁচ ব্যাংকের বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তারাও। এরই মধ্যে একীভূতকরণের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন দায়ের করেছেন এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) উদ্যোক্তারা। নতুন করে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের উদ্যোক্তারাও রিট করার উদ্যোগ নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এ তিন ব্যাংকের মালিকানা মূলত এস আলম গ্রুপের হাতে।
আওয়ামী লীগের সময়ে প্রবল ক্ষমতাশালী এ গ্রুপের বিরুদ্ধে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে।
একীভূতকরণের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট আবেদনকারীদের একজন এসআইবিএলের উদ্যোক্তা ডা. মো. রেজাউল হক। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ কর্তৃক নিয়ন্ত্রণে নেয়ার সময় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। এ উদ্যোক্তা ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আবারো এসআইবিএল পর্ষদে ফেরেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে সে সময় ব্যাংকটির জন্য যে পাঁচ সদস্যের পর্ষদ গঠন করে দেয়া হয়, তার মধ্যে একমাত্র উদ্যোক্তা পরিচালক হিসেবে তিনি স্থান পান। তবে দীর্ঘদিন পর ব্যাংকে ফিরলেও একীভূতকরণ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে গত বছরের অক্টোবরে এসআইবিএল পর্ষদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেন।
গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আমি শুরু থেকেই এসআইবিএলকে একীভূতকরণের বিরোধিতা করেছি। বাংলাদেশ ব্যাংক আমার আপত্তি আমলে না নেয়ায় উচ্চ আদালতে রিট করেছিলাম। সে সময় আদালত থেকে কোনো নির্দেশনা না পেলেও সম্প্রতি পেয়েছি। এসআইবিএল খুবই ভালো ব্যাংক ছিল। যাদের কারণে ব্যাংকটি বিপদে পড়েছে, তাদের শাস্তি না দিয়ে সব উদ্যোক্তাকে বঞ্চিত করে একীভূতকরণের সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল না। আমি এসআইবিএল ফেরত চাই। এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তারা ইতিবাচক। আশা করছি, এসআইবিএল একীভূতকরণ প্রক্রিয়া থেকে নিষ্কৃতি পাবে।’
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এক্সিম ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পুনর্গঠন করে দেয়া হয়। প্রায় দুই যুগ ধরে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণ করা হয় নাসা গ্রুপের কর্ণধার মো. নজরুল ইসলাম মজুমদারকে। ওই সময় নতুন চেয়ারম্যান হন ব্যাংকটির উদ্যোক্তা মো. নজরুল ইসলাম স্বপন। শুরু থেকেই তিনি এক্সিম ব্যাংককে অন্য ব্যাংকগুলোর সঙ্গে একীভূতকরণের বিরুদ্ধে ছিলেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একীভূতকরণ উদ্যোগ ঠেকাতে উচ্চ আদালতে রিটও দায়ের করেছিলেন। তবে সে সময় আদালত বিষয়টিকে আমলে নেননি বলে জানান নজরুল ইসলাম স্বপন।
তিনি বলেন, ‘এক্সিম কোনোভাবেই একীভূত হওয়ার মতো ব্যাংক ছিল না। আমাদের বিনিয়োগের গুণগতমান অন্য ব্যাংকগুলোর তুলনায় অনেক ভালো ছিল। আমদানি-রফতানিসহ বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এক্সিম ব্যাংকের অবস্থান ছিল সুদৃঢ়। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমাদের কোনো আপত্তিই আমলে নেয়নি। সে সময় আমরা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলাম। আদালতও আমাদের রিট আবেদন আমলে নেননি। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমরা আবারো আদালতের কাছে যাব। এক্সিম ব্যাংক কোনোভাবেই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে একীভূত হতে চায় না।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ‘সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে এ পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা ও ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিধিবিধান মেনেই এটি করা হয়েছে। একীভূতকরণের বিরুদ্ধে উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ আগেই আদালতে গিয়েছিলেন। কিন্তু আদালত সে সময় বিষয়টি আমলে নেননি। আশা করছি, ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে আদালত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের পক্ষেই থাকবেন।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের ব্যাংক খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর গত দেড় বছরে তিনি ১৫টি বেসরকারি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে বিএনপি। এর পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ গভর্নরের কথা শুনছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নতুন গভর্নর পদে একাধিক ব্যক্তির নামও শোনা যাচ্ছে।
তবে সরকারের দায়িত্বশীল একটি সূত্রমতে, এখনই গভর্নর পদে পরিবর্তনের কথা ভাবছে না সরকার। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও দেশের ব্যাংক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি জানতে চলতি সপ্তাহেই অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বাংলাদেশ ব্যাংকে যাওয়ার কথা রয়েছে। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি প্রেজেন্টেশন তৈরি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বিএনপি সরকার ব্যাংক একীভূতকরণের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, সেটির ওপর ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি নামে লাইসেন্স ইস্যু করা ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। আর পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা যোগান দিয়েছে সরকার। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী আমানত এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকে শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে মূলধনে অন্তর্ভুক্ত করার কথা রয়েছে।
গত ৩০ ডিসেম্বর ব্যাংকটির লোগো উন্মোচন করা হয়। এরপর ২৫ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে সেটি বাতিল করা হয়। কিছু আমানতকারী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যাংক কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানস্থলে ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি স্থগিত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের বিষয়ে তিন মাস ধরেই তৎপর ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষ করে শেষ পর্যন্ত ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাবিল মুস্তাফিজুর রহমানকে এমডি নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু নিয়োগের মাত্র দুইদিন পরই তিনি ব্যাংকটির এমডি পদে দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করেন। কারণ হিসেবে নিজের অসুস্থতার কথা জানিয়েছেন তিনি।
পর্ষদ ভেঙে দেয়ার পর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অডিট ফার্ম দিয়ে শরিয়াহভিত্তিক এ পাঁচ ব্যাংকের অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর) করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়াং’ ও ‘কেপিএমজি’র করা এ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংকে জমা থাকা আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। আর ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণ (বিনিয়োগ) স্থিতি ১ লাখ ৯১ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকাই খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সে হিসাবে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৭৬ দশমিক ৬৯ শতাংশই খেলাপি।
এ পাঁচ ব্যাংকের সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ ৭৪ হাজার ৫০১ কোটি টাকা বলে নিরীক্ষায় উঠে আসে। সারা দেশে ৭৬১টি শাখায় ১৮ হাজার ৮১ জন কর্মী এ ব্যাংকগুলোতে কর্মরত রয়েছেন।
সূত্র: বণিক বার্তা
এএ
ব্যাংকার প্রতিবেদন