ঢাকা, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

৯ ফাল্গুন ১৪৩২, ০৪ রমজান ১৪৪৭

অমর একুশের শহীদ মিনার আমাদের অহঙ্কার

ব্যাংকার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১১:১১, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১১:১১, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

অমর একুশের শহীদ মিনার আমাদের অহঙ্কার

মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন) বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। যা ঐতিহাসিক এক দৃষ্টান্ত হয়ে বিশ্ব দরবারে দৃপ্তি ছড়াচ্ছে। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলনে নেমে সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ অসংখ্য সাহসী সন্তান জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁদের আত্মত্যাগ কেবল একটি ভাষার জন্য নয়—একটি জাতির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের প্রতীক। সেই সংগ্রামের স্থাপত্যরূপই আজকের শহীদ মিনার। অমর একুশের শহীদ মিনার আমাদের অহংকার।

১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয়। ভাষাশহীদদের স্মরণে গড়ে ওঠা সেই অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ দ্রুতই তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়ে ভেঙে ফেলা হয়। তবে দমন-পীড়ন আন্দোলনের অঙ্গীকারকে থামাতে পারেনি। ১৯৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুনরায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন। বর্তমান শহীদ মিনারের প্রধান স্তম্ভের উচ্চতা প্রায় ১৪ মিটার (৪৬ ফুট)। এর বাঁকানো স্তম্ভ যেন মায়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা সন্তানের প্রতীক—মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া শহীদদের স্মরণে এক শিল্পিত স্থাপত্যভাষা।

নকশা ও বিতর্ক: শিল্পের ভেতরের ইতিহাস 

শহীদ মিনারের নকশা প্রণয়নে যুক্ত ছিলেন শিল্পী হামিদুর রহমান এবং ভাস্কর নভেরা আহমেদ। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন-এর নির্দেশনায় স্কেচ ও মডেল প্রস্তুতের কাজ এগোয়।

নকশা নিয়ে সময়ের সঙ্গে নানা বিতর্ক তৈরি হলেও ইতিহাসে তাঁদের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গবেষকদের মতে, প্রাথমিক নকশায় একাধিক মুরাল ও শিল্পভাষা যুক্ত ছিল, যা পরবর্তী বাস্তবতার বিবেচনায় রূপান্তরিত ও সংযত করা হয়। 

শহীদ মিনার কেবল একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়—এটি আধুনিক বাংলাদেশের স্থাপত্য-চিন্তার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও গবেষকদের মতামত
কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও তাত্ত্বিক সাখাওয়াত টিপু বলেন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বাঙালি জাতির গৌরবের একটি স্মারকচিহ্ন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ মিনারের নকশা নিয়ে বিতর্ক এখনও সুরাহা হয়নি। হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমেদের ভাষ্যমতে, প্রথমে মাটি দিয়ে প্রাথমিক শহীদ মিনারের নমুনা বানান নভেরা।

নকশা ও মডেল জমা দেয় হামিদুর রহমান। নভেরার মডেলে মূল ভূমিকা ছিল ‘আনত মায়ের মতন কার্ভ’। ওইটা মূলত নভেরাই বানান। শহীদ মিনার নির্মাণের প্রাথমিক নকশায় অনেক মূর‌্যাল ছিল। আমরা যেটা দেখি বর্তমানে যে শহীদ মিনার রয়েছে তাতে অনেক রিফাইন করা হয়েছে। 

নকশাকার সাঈদ হায়দারের এক লেখনিতে জানা যায়, ১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিকেলে ইটের গাঁথুনি দিয়ে ভাষাসৈনিক সাঈদ হায়দারের নকশায় তৈরি হয়েছিল ‘স্মৃতিস্তম্ভ’। এর দু’দিন পর তৎকালীন সরকার সেটি ভেঙ্গে দেয়। 

জানা যায়, ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান শহীদ মিনারের পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য প্রধান প্রকৌশলী জব্বার এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে অনুরোধ জানান। শহীদ মিনারের জন্য নকশা আহ্বান করা টেন্ডার খবরের কাগজে কোনো বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়নি। কেন না সে সময়ে শহীদ মিনার নির্মাণটা খুবই স্পর্শকাতর ছিল। জয়নুল আবেদিন সরাসরি চিত্রশিল্পী হামিদুর রহমানকে স্কেচসহ মডেল দিতে নির্দেশনা দেন। স্থাপত্য ভাস্কর্যের মূল নকাশা প্রণয়নে যুক্ত হন নভেরা আহমেদও। শহীদ মিনারের নকশা নিয়ে হামিদ ও নভেরা কাজ শুরু করেন। যদিও নথিপত্রে শহীদ মিনারের নশকাকার হিসেবে শিল্পী হামিদুর রহমানের নাম উল্লেখ রয়েছে। 

একুশে পদক প্রাপ্ত স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুম বাসসকে বলেন, শিল্পী হামিদুর রহমান এবং নভেরা আহমেদের শহীদ মিনারের মূল নকশা সম্পর্কে আমি খুব বেশি কিছু জানি না। কিন্তু কোনো কোনো প্রবন্ধ এবং কারো ব্যক্তিগত বিবরণ থেকে জানা গেছে যে, বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি তাদের দু’জনের মূল নকশা পুরোপুরি অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি। তিনি বলেন, তৎকালীন প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশে স্মৃতিস্তম্ভ, ভাস্কর্য, স্থাপত্য প্রায়শই নিপীড়িত ও নিপীড়কদের রোষের সম্মুখীন হয়েছে। যেমনটি আমরা অতীতে এবং আমাদের সাম্প্রতিক সময়ের অভিজ্ঞতায়ও দেখেছি। নভেরা আহমেদ বাংলাদেশের শিল্পজগতের অত্যন্ত সম্মানিত নাম। শহীদ মিনারের সহ নকশাকার হিসাবেও তার নাম সুপ্রতিষ্ঠিত। 

রাজশাহীতে গোপন নির্মাণের ইতিহাস

ভাষা আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বাইরেও। রাজশাহী কলেজ ও মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে মুসলিম হল প্রাঙ্গণে কাদামাটি, বাঁশ ও ইট দিয়ে গোপনে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। পরদিন ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটিও ভেঙে দেয় পুলিশ। দীর্ঘ সময় পর, ২০০৯ সালে সেই ঐতিহাসিক স্থানে একটি স্মারক ফলক নির্মিত হয়, যা আজও ভাষা সংগ্রামের স্মৃতি বহন করছে।

রাজশাহীর ভাষা সৈনিক মোশারফ হোসেন আকুঞ্জি বলেন, রাজশাহী কলেজে অবস্থিত এই শহীদ মিনার ঢাকার শহীদ মিনারের আগে হয়েছে। ২১শে ফেব্রুয়ারি রাতেই আমরা এই স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তুলেছিলাম। এজন্য আমরা রাজশাহী কলেজের মুসলিম হোস্টেলের পাশে নির্মিত তৎকালীন শহীদ মিনারটি দেশের প্রথম শহীদ মিনার হিসেবে সরকারের কাছে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দাবি করছি। 

বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে দাবির জন্য ছাত্ররা আগে থেকেই আন্দোলন করছিল। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছিল। সে সময়ে রাজশাহী থেকে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা এরকম এত ভালো ছিল না। তখন আমারা কাছ থেকে এই খবরটা সঠিকভাবে পাই। যে খবরটা দিল সে বলল যে, ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে। ঢাকায় গুলি বর্ষণ হয়েছে; অনেক ছাত্র মারা গেছে। 

এবং তারা সংসদ ভবনে মিছিলকে যেতে দেয় নাই।’ এই খবর পেয়ে আমরা সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহীর যত ছাত্রবাস ছিল সেই ছাত্রবাসের ছাত্রদেরকে খবর দিই। তাদেরকে বলি, আপনারা আসুন এরকম নির্মমভাবে এই মুসলিম লীগ সরকার খুনি সরকার রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য গুলি করেছে এবং আমাদের ভাইয়েরা; আমার ছাত্রীরা নিহত হয়েছে। 

প্রবীণ এ ভাষাসৈনিক বলেন, ‘এজন্য আমরা কি করতে পারি আসুন রাজশাহী সরকারি কলেজের নিউ হোস্টেলের  ভেতরে মিটিং হবে এবং এই খবর পেয়ে সমস্ত ছেলেরা এবং যারা হোস্টেলে থাকতো তারা উপস্থিত হয়।  অন্তত কয়েক’শ ছাত্র সেখানে ছিল তার মধ্যে ডাক্তার গাফফার, এসএম আব্দুল গাফফার, এডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু এবং বিখ্যাত একজন নাট্যকার অধ্যাপক মমতাজউদ্দিন আহমদ, অ্যাডভোকেট মহসিন প্রামাণিক এবং উপস্থিত ছিলেন লুতফুর রহমান মল্লিক, সাইদউদ্দিন আহমদ,আব্দুর রাজ্জাক এবং আমি মোশারফ হোসেন আকুঞ্জিসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলাম। 

তিনি বলেন, শহীদদেরকে আমরা কিভাবে স্মরণ রাখব এটা নিয়ে মিটিং হয়। পরে সবার মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত হয় যে, আমরা একটা শহীদ মিনার করব। তাৎক্ষণিকভাবে আশেপাশের সমস্ত ইট পাটকেল সংগ্রহ করে কাদা মাটির গাথনি দিয়ে রাত ১২ টা পর্যন্ত আমরা এই শহীদ মিনার গড়ে তুলি এবং তাতে আমরা একটা কাগজের পোস্টার বানিয়ে তাতে লিখে দেই ‘ভয় নাই, ওরে ভয় নাই, সে প্রাণ যে করি বিধান, ক্ষয় নাই তার ভয় নাই।’

আকুঞ্জি বলেন, অনেক রাতে আমরা সবাই যে যার বাসায় চলে যাই। পরে শুনতে পাই যে তখন এই মুসলিম লীগের গুন্ডারা শহীদ মিনারটি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু করার কিছু ছিল না; আমাদের নীরব থাকতে হয়েছে। 

তিনি আরো বলেন, আমাদের দাবি এই শহীদ মিনারটিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ মিনার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সময়  এসেছে। এর ন্যায্যতা এবং সত্যতা আছে। 

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বৈশ্বিক প্রতীক

১৯৫২ সালের পর থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিশ্বজনীন মর্যাদা পায়। আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শহীদ মিনারের আদলে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। 

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সেখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার বার্তা উচ্চারিত হয়।

সর্বোচ্চ শহীদ মিনার: প্রতীকের ভেতরে ইতিহাস

দেশের সর্বোচ্চ শহীদ মিনারটি অবস্থিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এ। স্থপতি রবিউল হুসাইন-এর নকশায় নির্মিত এ মিনারের উচ্চতা ৭১ ফুট—মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক। ৫২ ফুট ব্যাসের ভিত্তিমঞ্চ ভাষা আন্দোলনের স্মারক; আটটি সিঁড়ি ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত স্বাধীনতার পথে ধারাবাহিক সংগ্রামের ইঙ্গিত দেয়। তিন ভাগে বিভক্ত স্তম্ভ ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, মাটি-মানুষ-সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব-গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

চেতনার স্থাপত্য
শহীদ মিনার কেবল ইট-পাথরের নির্মাণ নয়; এটি বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীক। 

একুশের প্রথম প্রহরে খালি পায়ে ফুল হাতে মানুষের যে স্রোত সেখানে সমবেত হয়, তা প্রমাণ করে—ভাষার জন্য দেওয়া রক্ত বৃথা যায়নি। অমর একুশ আমাদের শিখিয়েছে—ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও ভবিষ্যতের ভিত্তি। শহীদ মিনারের স্তম্ভ তাই আজও দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে— বাংলার অহংকার, অমর একুশের অমলিন প্রতীক হয়ে। 

সূত্র: বাসস

এএ

 

ব্যাংকার প্রতিবেদন

আরও পড়ুন