ব্যাংকার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১০:৪০, ৭ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১০:৪৩, ৭ মার্চ ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে এটা বিএনপির প্রতিশ্রুতি ছিল। এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের ব্যয় হবে ১ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা এবং এতে প্রায় ১২ লাখ কৃষক সুফল পাবেন।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পর ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের প্রক্রিয়া শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। মোট ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৪৯৮ জন কৃষক এ ঋণ মওকুফের সুবিধা পাবেন। এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ব্যয় হবে ১ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা।
আগামী সপ্তাহে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ পুরো টাকা দিয়ে দেবে একই মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে। পরে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে টাকা পাবে ১৫ ব্যাংক। তার আগে নিরীক্ষা করতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এ নিয়ে বৈঠক করে ২ মার্চ। সেই বৈঠকে ঠিক হয়, ১২ লাখ নয়, ঋণ মওকুফ–সুবিধা পাবেন মোট ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৪৯৮ জন কৃষক। এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ব্যয় হবে ১ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের টাকা পাবে ১৫টি ব্যাংক। এর মধ্যে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক আটটি। এগুলো হচ্ছে কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক বা রাকাব, সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, বেসিক ও আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক।
এ ছাড়া বেসরকারি ব্যাংক রয়েছে সাতটি। এগুলো হচ্ছে- ইসলামী ব্যাংক, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, উত্তরা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক।
রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ৮ ব্যাংক ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৪৭ জন কৃষকের কৃষিঋণের বিপরীতে টাকা পাবে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। আর বেসরকারি ৭ ব্যাংক পাবে ৪৫১ জন কৃষকের ঋণের বিপরীতে ৩৯ লাখ টাকা।
তিন ব্যাংকেরই বেশি টাকা
অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মওকুফ সুবিধার আওতায় থাকা মোট ১৫ ব্যাংকের দেওয়া কৃষিঋণের আসল ৯১৭ কোটি টাকা আর ৭৮২ কোটি সুদ। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর অনিশ্চিত (ইন্টারেস্ট সাসপেন্স) হিসাবে আছে আরও ১৩৮ কোটি টাকা। মওকুফের জন্য অনিশ্চিত হিসাবের টাকা বাদ রাখা হয়েছে। খেলাপি হওয়ার পর অর্জিত সুদ অনিশ্চিত হিসেবে জমা রাখা হয়, যা ব্যাংকের প্রকৃত আয় হিসাবে গণ্য হয় না।
আসল ও সুদের পাশাপাশি মওকুফের আওতায় রাখা হয়েছে ঋণ আদায়ে বিভিন্ন ব্যাংকের করা মামলার বিপরীতে আইনি খরচও। কৃষি ব্যাংক, রাকাব, সোনালী, অগ্রণী, জনতাসহ সাতটি ব্যাংকের করা মামলার বিপরীতে আইনি খরচবাবদ সরকার থেকে দেওয়া হবে ৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, মওকুফ সুবিধার আওতায় ৬ লাখ ৮৯ হাজার ৬২৮ জন কৃষকের বিপরীতে সুদসহ ঋণের টাকা বাবদ কৃষি ব্যাংক পাবে ৮২০ কোটি ২২ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সোনালী ব্যাংক। ৩ লাখ ৪ হাজার ৪৪৭ জন কৃষকের বিপরীতে এ ব্যাংক পাবে ৩৫০ কোটি ১২ লাখ টাকা। রাকাবের কাছ থেকে এই সুবিধা পাবেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫৬৪ জন কৃষক। এ জন্য সরকারের কাছ থেকে ব্যাংকটি পাবে ১৮৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ২২৮ কৃষকের ঋণের মওকুফের বিপরীতে সবচেয়ে বেশি ২০ লাখ ৯৮ হাজার টাকা পাবে ইসলামী ব্যাংক। পরের অবস্থানে আছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। ১৯৩ কৃষকের ঋণের বিপরীতে এ ব্যাংক পাবে ১৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা।
যেভাবে ঋণ মওকুফ হবে
অর্থ বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক এখন একটি ছক তৈরি করে দেবে, সেই ছকের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো যার যার তথ্য অর্থ বিভাগে পাঠাবে। তার আগে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনারোপিত সুদ হিসাব করে ব্যাংকগুলো তাদের নিজ নিজ পরিচালনা পর্ষদের সভায় ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্তের অনুমোদন নেবে। এসব হিসাবে ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন করে আর কোনো সুদ আরোপ করা যাবে না এবং ব্যাংকগুলোর খতিয়ান (লেজার) থেকে তা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করতে হবে। ঋণ–সংশ্লিষ্ট মামলা থাকলে স্ট্যাম্প মাশুলসহ অন্যান্য খরচ সরকার বহন করবে, তবে আইনজীবীর খরচ বহন করবে না।
অর্থ বিভাগ বলেছে, অনিশ্চিত হিসাবে থাকা সুদ ও আসলের দায় গ্রহণের সুযোগ সরকারের নেই। বিষয়টি সরকার ও ব্যাংকের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধান করা হবে।
সূত্র জানায়, ব্যাংকগুলো ঋণ মওকুফের যে তথ্য দেবে, তা আবার নিরীক্ষা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিরীক্ষিত চূড়ান্ত হিসাব পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক পাঠাবে সরকারের কাছে। সরকার পরে নিরীক্ষিত অংশের দায় পরিশোধ করবে ব্যাংকগুলোকে। দায় পরিশোধের পর মামলা প্রত্যাহার করে নেবে ব্যাংক এবং প্রতি মাসে মামলা প্রত্যাহারের তথ্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে অবহিত করবে ব্যাংকগুলো।
সূত্র: প্রথম আলো
এএ
ব্যাংকার প্রতিবেদন