ঢাকা, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

১০ ফাল্গুন ১৪৩২, ০৫ রমজান ১৪৪৭

নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য সংস্কার-রোডম্যাপ রেখে গেলেন অর্থ উপদেষ্টা

ব্যাংকার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৬:৩৭, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৭:১৭, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য সংস্কার-রোডম্যাপ রেখে গেলেন অর্থ উপদেষ্টা

নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য আর্থিক খাত সংস্কার, রাজস্ব বৃদ্ধি ও সামষ্টিক স্থিতিশীলতা জোরদারে বিস্তৃত সুপারিশ রেখে গেছেন বিদায়ী অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। তাঁর ২৯ পৃষ্ঠার ‘সাকসেসর নোট’-এ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাঠামোগত সংস্কার থেকে শুরু করে করব্যবস্থার আধুনিকায়ন পর্যন্ত নানা প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।

নোটে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক একদিকে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করছে, অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ-তদারকি করছে। এতে স্বার্থের সংঘাত ও জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। তাই ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম’ ছাড়া অন্যান্য তদারকি দায়িত্ব আলাদা একটি স্বাধীন সংস্থার হাতে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

সরকার নীতিগত সম্মতি দিলে এ বিষয়ে ধারণাপত্র তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সালেহউদ্দিন আহমেদ অতীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে তিনি অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বল তদারকির প্রেক্ষাপটে এই কাঠামোগত সংস্কারের পরামর্শ এসেছে বলে জানা গেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাংক তদারকির কাঠামো ভিন্ন। যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাপান-এ আলাদা তদারকি সংস্থা রয়েছে। অন্যদিকে ভারত ও ফিলিপাইন-এ কেন্দ্রীয় ব্যাংকই উভয় দায়িত্ব পালন করে।

ব্যাংক রেজোল্যুশন ও আমানত সুরক্ষা

নোটে পৃথক ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন কর্তৃপক্ষ’ ও ‘আমানত সুরক্ষা করপোরেশন’ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রমের জন্য আলাদা আইন প্রণয়নের কথাও বলা হয়েছে। আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এসব পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার বজায় রাখা, উচ্চ অগ্রাধিকার উন্নয়ন প্রকল্পে মনোযোগ এবং উচ্চ সুদের ঋণ গ্রহণে সংযমের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

নোটে উল্লেখ করা হয়, গত এক দশকে পুঞ্জীভূত মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ১১১ শতাংশ। সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান রক্ষায় নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

অর্থ বিভাগকে ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ, অপচয় রোধ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে দক্ষতা বাড়ানোকে তাৎক্ষণিক করণীয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সীমিত রাজস্ব প্রবাহ ও উচ্চ সুদ ব্যয়ের বাস্তবতায় বাজেট বাস্তবায়নে অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যয় নির্ধারণের কথাও বলা হয়েছে।

কর ব্যবস্থায় সংস্কারের তাগিদ

রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ক্ষেত্রে দেড় বছরে নেওয়া পদক্ষেপের বিবরণ দিয়ে নোটে জানানো হয়, করব্যবস্থা সংস্কারসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

চ্যালেঞ্জ হিসেবে ব্যাপক কর ফাঁকি, কর অব্যাহতির সংস্কৃতি, আয়কর ও ভ্যাট ব্যবস্থায় অপর্যাপ্ত ডিজিটাইজেশন এবং কর আদায়ে ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে আর্থিক খাত পুনর্গঠন, রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক স্থিতিশীলতা জোরদারকে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়েছে এই সাকসেসর নোটে।

এসব বিষয়ে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে এতো বেশি ব্যাংক হয়ে গেছে যে আমার মনে হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। এটাই তো তারা ভালোভাবে করতে পারে না। 

তিনি আরও বলেন, ‘আমি চাই ব্যাংক খাত তদারকির দায়িত্বটা আলাদা দপ্তর করবে। ভবিষ্যতের জন্য তাই এ ধারণাটা দিয়ে গেলাম। এটা করা গেলে পুরো ব্যাংক খাত তথা অর্থনীতি উপকৃত হবে।’

এএ

ব্যাংকার প্রতিবেদন

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন