ব্যাংকার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১১:১৬, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১১:১৭, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দেশে সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি জেঁকে বসেছে। কঠোর মুদ্রানীতি, আমদানি পণ্যে করছাড় ও বাজার ব্যবস্থাপনায় নেয়া নানা উদ্যোগের পরও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফলতা আসেনি। দেশে খাদ্যমূল্যস্ফীতির প্রায় ৬৩ শতাংশই আমিষজাতীয় খাদ্যপণ্যের।
সামনে রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে আমিষজাতীয় পণ্যের চাহিদা আরো বাড়বে। এরই মধ্যে গত এক মাসে প্রায় সব ধরনের আমিষপণ্যেরই দাম বেড়েছে। এ অবস্থায় মানুষের পুষ্টিচাহিদার অন্যতম উৎস আমিষপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব না হলে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যেতে পারে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে দেশের মূল্যস্ফীতির গতিবিধি নিয়ে ‘ইনফ্লাশন ডায়নামিকস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক নিয়মিত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ তিন মাসে খাদ্যমূল্যস্ফীতির ৬২ দশমিক ৮ শতাংশই এসেছে আমিষজাতীয় খাদ্যপণ্য থেকে। মূল্যস্ফীতির বাস্কেটে থাকা আমিষজাতীয় খাদ্যপণ্যের মধ্যে রয়েছে প্রাণিজ মাংস (গরু, খাসি, হাঁস ও মুরগি), মাছ ও শুঁটকি, বিভিন্ন ধরনের ডাল, দুধ ও পনির।
অবশ্য এ সময়ে সবজির দাম কম থাকার কারণে খাদ্যমূল্যস্ফীতিতে সবজির অবদান ছিল ঋণাত্মক। তাছাড়া এ সময়ে মসলা ও রান্নায় ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে খাদ্যমূল্যস্ফীতিতে ভোজ্যতেলের অবদান এ সময়ে সামান্য কমেছে। আলোচ্য প্রান্তিকে খাদ্যমূল্যস্ফীতিতে খাদ্যশস্যের অবদান ছিল ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ।
গত বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ৮ শতাংশের ওপরে ছিল। এ সময়ে খাদ্যমূল্যস্ফীতি ছিল ৭ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে অক্টোবরে খাদ্যমূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক শূন্য ৮, নভেম্বরে ৭ দশমিক ৩৬ ও ডিসেম্বরে ৭ দশমিক ৭১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ গত জানুয়ারিতে খাদ্যমূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ হয়েছে। এ সময়ে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদায়ী বছরের মতো জানুয়ারিতেও দেশে সবজির বাজার বেশ চড়া ছিল। বিশেষ করে শীত মৌসুম শুরুর পরও গত নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সবজির দাম বেশি একটা কমেনি। ডিসেম্বরের শেষের দিকে কৃষকপর্যায়ে সবজির দামে বড় পতন হলেও তার সুফল ক্রেতাপর্যায়ে পৌঁছেনি। আবার গত বছর চাল, ডাল, চিনি, আটা, মাছ-মাংস, এলপিজি গ্যাসসহ বেশির ভাগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। এ কারণে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
এক মাস ধরেই অধিকাংশ আমিষজাতীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, খুচরা বাজারে চাষের রুই মাছের কেজিপ্রতি দাম ছিল ৩৫০-৪৮০ টাকা, যেখানে এক মাস আগে দাম ছিল ৩২০-৪২০ টাকা। একইভাবে চাষের কাতল মাছের দাম ৩৩০-৪৩০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৫০-৪৮০ টাকা। চাষের তেলাপিয়া মাছ গতকাল কেজিপ্রতি ২০০-২৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এক মাস আগে যা ছিল ১৭০-২৫০ টাকা। মাছের পাশাপাশি এ সময়ে মাংসের দামও বেড়েছে। গতকাল ব্রয়লার মুরগির কেজিপ্রতি দাম ছিল ১৮০-২০০ টাকা, যেখানে এক মাস আগে ১৭০-১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কক বা সোনালি মুরগি গতকাল প্রতি কেজি ৩৩০-৩৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এক মাস আগেও যা ছিল ৩০০-৩২০ টাকা। দেশী মুরগির দাম এক মাস আগের কেজিপ্রতি ৫৬০-৬০০ থেকে বেড়ে ৬৫০-৭০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। গরুর মাংসের দাম গতকাল খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ৭৫০-৭৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যেখানে এক মাস দাম ছিল ৭২০-৭৮০ টাকা। খাসির মাংসের দাম গতকালের বাজারে কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা ছিল, এক মাস এর দাম ছিল ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যে প্রায় দুই বছর ধরে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে ধরে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর প্রভাবে ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪-১৫ শতাংশে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ সুদহার কার্যকর থাকলেও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বরং দেশের অর্থনীতিতে চলছে বিনিয়োগ খরা।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সুদহার কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। যদিও তাদের এ দাবি উপেক্ষা করেই নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে সম্প্রতি মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরও বলেছিলেন, ‘মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় নামিয়ে আনা ছাড়া বাকি সূচকগুলোতে মুদ্রানীতি সফল হয়েছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা দেখেছি নীতি সুদহার বাড়িয়েও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমানো সম্ভব হয়নি। ফলে এক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের গৃহীত নীতি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রমজান মাসকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে আমিষজাতীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। মূল্যবৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে এটি মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দেবে। আগামীকাল নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। নতুন এ সরকারকে যথাযথ বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হবে।’
দেশে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকেই মূল্যস্ফীতির গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। আলোচ্য অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। এর পরের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরো বেড়ে ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে দাঁড়ায়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দেশের মানুষের প্রধান প্রত্যাশা ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনামলে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ভেঙে যাওয়ার সুফল পাওয়ার কথা ছিল জনগণের। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে সেটির বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়নি। বরং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই এ সরকার বিদায় নিতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন দায়িত্ব নিতে যাওয়া সরকারকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চাপ নিতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘খাদ্য মূল্যস্ফীতির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে সেটি কাঠামোগত কারণে। এর সমাধানের জন্য সেদিকেই নজর দিতে হবে। বাজার ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। সেই সঙ্গে শুল্কনীতি যৌক্তিকীকরণের মাধ্যমে বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া অলিগার্করা যাতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণকে পুঁজি করে অবৈধ সুবিধা নিতে না পারে সেটি নিশ্চিত করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সরকারের পক্ষেই সম্ভব। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নতুন যে সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করতে যাচ্ছে, তারা এক্ষেত্রে উদ্যোগ নেবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা।’
সূত্র: বণিক বার্তা
এএ
ব্যাংকার প্রতিবেদন