ব্যাংকার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৭:৩৪, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৭:৩৪, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। গতকাল শপথ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীসহ নতুন সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা। গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও পরবর্তী সময়ে দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে অর্থনীতি ছিল মূলত স্থবির। বিনিয়োগেও আশাজাগানিয়া কোনো সুখবর ছিল না। ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান সবখানেই ছিল একধরনের স্থবির অবস্থা। এ কারণে নির্বাচিত সরকারের কাছে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি।
ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি বিষয়ে নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা ও করণীয় বিষয়ে কথা বলেছেন দেশের ব্যাংকের একজন শীর্ষ নির্বাহী মাসরুর আরেফিন।
আমাদের নতুন সরকার এমন এক ব্যাংকিং-ব্যবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, যা তিনটা পরস্পর সম্পর্কিত দুর্বলতায় জর্জর। দুর্বল শাসনব্যবস্থা বা গভর্ন্যান্স, দুর্বল ব্যালান্স শিট বা স্থিতিপত্র আর নীতি বা পলিসি সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষের দুর্বল হয়ে যাওয়া বিশ্বাস। এবার বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করা যাক।
প্রথম আসে সম্পদের গুণগত মান ও সুশাসনের প্রশ্ন। ভয়ংকর উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ, বারবার ঘটে যাওয়া ঋণ জালিয়াতির সব ঘটনা, আর স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার প্রবণতা ব্যাংকিং খাতের ওপর মানুষের আস্থাকে একদম তলানিতে নিয়ে গেছে। তাই ব্যাংক খাতে সংস্কারের মূল স্লোগান হওয়া উচিত দুই শব্দে: ‘গভর্ন্যান্স ফার্স্ট’(শাসনব্যবস্থা আগে)।
এখন প্রশ্ন আসে, এইটা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে? এ জন্য শুরুতে ব্যাংকের পরিচালক ও সিইওদের জন্য সঠিক ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’পরীক্ষা সম্পন্ন করার বাস্তবসম্মত স্মার্ট নীতিমালা গ্রহণ ও তার কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। ঋণের টাকা আসলে কার কাছে যাচ্ছে, সেই প্রকৃত মালিকানা বা বেনিফিশিয়াল ওনারশিপের স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট ঘোষণার ব্যবস্থা করতে হবে। এ-সংক্রান্ত পরিষ্কার আইন প্রয়োজন। পরিচালকদের মেয়াদ, অন্য ব্যাংকে বিনিয়োগের সীমা, স্বতন্ত্র পরিচালক বিষয়ক কথাবার্তা সব পুনর্বিবেচনা করে হবে, যেমন ‘পরিবার’কাকে বলা হবে, সেই সংজ্ঞা ঠিক করে প্রচলিত সব ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে ফেলতে হবে। অর্থাৎ, ব্যাংক কোম্পানি আইনকে ব্যাসেল-এর প্রধান মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। যে মূলনীতিতে বলা আছে, বাস্তব পরিস্থিতিভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মূল কথা। এ দেশে কোনো কেলেঙ্কারি ঘটে যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ‘প্রতিক্রিয়াশীল‘আইন তৈরি হয়, যে-আইন ভালো আর মন্দের বাছবিচার করে না। তাই আখেরে ভালোকেও মন্দ বানিয়ে ছাড়ে। এসব পুরোনো ‘শাস্তিমূলক‘জনতুষ্টিকর চিন্তা বিপজ্জনক।
দ্বিতীয়ত আসে মূলধন ও ব্যাংক রেজোল্যুশনের বড় প্রশ্ন। সব দিক বিবেচনায় নিয়ে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলধন বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে, যার ফলে সামনে চলে এসেছে চেপে রাখা বা গোপন রাখা দেউলিয়াত্বের সমস্যা। তাতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে বারবার পুনঃ মূলধন জোগানের। তাই নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত, একটি নিরপেক্ষ বা স্বাধীন সম্পদ মান পর্যালোচনা, যা অনেকাংশে ইতিমধ্যেই করা হয়ে গেছে। এখন প্রয়োজন সময়সীমা ঠিক করে পুনঃ মূলধন জোগানের পরিকল্পনাটুকু করা। তবে এটা কেবল সেই সব ব্যাংকের জন্য প্রযোজ্য করা উচিত, যারা ঋণ অবলোপন, সুশাসনকেন্দ্রিক সংস্কার এবং মন্দ ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে দেওয়া ‘ব্যাংক পুনর্গঠন’শর্ত মেনে নিতে রাজি। এই কাজটি করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর যারা এসব ব্যবস্থায় রাজি হতে অপারগতা জানাবে, তাদের জন্য ব্যবহার করতে হবে অন্যান্য ব্যাংক রেজোল্যুশন টুলকিট; যেমন ব্রিজ ব্যাংক তৈরি, পারচেজ অ্যান্ড অ্যাসাম্পশন পরিকাঠামো (একটা ভালো ব্যাংক একটা দুর্বল ব্যাংকের সম্পদ কিনে নেবে এবং দুর্বল ব্যাংকের আমানতের দায় নেবে) তৈরি, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করা ইত্যাদি। নতুন ব্যাংক রেজোল্যুশন নীতিমালায় এসব ইতিমধ্যেই আছে। বর্তমান গভর্নর এ সবকিছুই স্পষ্ট বোঝেন। এখন সময় এসব বিষয় বাস্তবায়নের।
তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কার। রাজস্ব অপচয় বন্ধ করতে হবে এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরাতে আমাদের উচিত এটুকু বোঝা যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ আর শাসনকাঠামোয় আমূল সংস্কার আনাটা এ মুহূর্তে অপরিহার্য। এই একীভূতকরণ একটা কাজের কাজ হবে কেবল যদি জবাবদিহি, পেশাদার পর্ষদ গঠন এবং ঋণ আদায়ের কঠোর নির্দেশনাকে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে শর্ত হিসেবে যুক্ত করা যায়।
চতুর্থত, মুদ্রানীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার মধ্যে সমন্বয় নিয়ে কথা বলা জরুরি। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি আর নীতি বিষয়ক এলোমেলো সংকেত (সুদের হারের করিডর ইচ্ছেমতো বদলানো, তারল্য সরবরাহ চালু রাখা, যখন কিনা বলা হচ্ছে সংকোচনের কথা, ইত্যাদি) আমাদের সবার নীতির ওপরে বিশ্বাসকে ক্ষুণ্ন করছে। এ ব্যাপারে কথা বললে ঘুরে-ফিরে আসে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতার কথা,যেটা অনেক জরুরি। এ ছাড়া বেশি বেশি রেগুলেট বা নিয়ন্ত্রণ করার তাড়ণাকে উল্টোপথে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আর নিয়ন্ত্রকের তরফ থেকে এবিবির সঙ্গে ইগো-বিহীন যোগাযোগ অব্যাহত রাখার কথাও চলে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংককে মূল্যস্ফীতির একটা নির্দিষ্ট রোডম্যাপ বা পথ অনুসরণ করতেই হবে, মানে তাদেরকে পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়া বন্ধ করতে হবে। সেই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে যেন সুদহারের করিডরই আমানতের সুদহার ও ঋণের সুদহার নির্ধারণ করে, কারও চাপে যেন সেটি না হয়।
শেষ কথা, আইনের প্রয়োগ ও আস্থার বিষয়টা উল্লেখ না করলে এসব প্রত্যাশার কথা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। দ্রুততর সময়ে মন্দ ঋণ আদায়ের আদালত-সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা, ক্রেডিট ব্যুরো তৈরি, অর্থ পাচারবিরোধী আইনের প্রয়োগ আর ব্যাংকের স্বাস্থ্য কেমন, সেই প্রতিবেদন স্বচ্ছভাবে প্রকাশের মাধ্যমে ঋণবিষয়ক শৃঙ্খলা জোরদার করতে হবে।
লক্ষ্যটা সহজ: হঠাৎ হঠাৎ জনগণকে বিস্মিত করা বন্ধ করতে হবে। আমাদেরকে নিয়ে যেন ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় বা আগে থেকে সব অনুমান করা যায়, সেই সার্বিক ব্যবস্থাই হচ্ছে একটি ভালো ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত ব্যবস্থা। বিনিয়োগ আসে স্পষ্টতা থেকে, স্লোগান থেকে নয়।
মাসরুর আরেফিন: চেয়ারম্যান, অ্যাসোসিয়েশর অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি); ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও, সিটি ব্যাংক
এএ
ব্যাংকার প্রতিবেদন